সন্তানসম্ভবা মায়ের মা হওয়ার উচ্ছ্বাস আর বাবার জন্মদাতা পিতা হওয়ার আবেগ যেন মুহূর্তেই উবে যায়। প্রিয় সন্তানটিকে হারিয়ে হাসপাতালের করিডোরে কান্নার শব্দটাও এখন ভারী হয়ে ওঠে। সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে বাবা যখন নির্বাক হয়ে বসে থাকেন, আর মায়ের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে মেঘনাপাড়ের বাতাস-তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নির্মম সত্য: চাঁদপুর জেলায় নবজাতকদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আজ চরম সংকটের মুখে।
অভিযোগ উঠেছে, সুচিকিৎসা এবং জরুরি নিবিড় পরিচর্যার (এনআইসিইউ) অভাবে চাঁদপুর ও এর আশপাশের এলাকায় প্রতি মাসে ডজন ডজন নবজাতক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। অভিভাবক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে শুরু করে উপজেলার অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নবজাতকের এনআইসিইউ ও এসকানু (ঝঈঅঘট) সেবার অবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। কাগজে-কলমে নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেবলই শুভঙ্করের ফাঁকি।
সরকারি হাসপাতালের চিত্র: নামমাত্র সেবা ও অব্যবস্থাপনা
চাঁদপুর জেলা শহরের একমাত্র সরকারি জেনারেল হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু কোনো শিশু শ্বাসকষ্ট, প্রিম্যাচিউর বার্থ (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া) বা জন্ডিসের মতো জটিলতা নিয়ে জন্ম নিলে তার কপালে জোটে করুণ অনিশ্চয়তা।
চাঁদপুর সরকারি হাসপাতালে এসকানু (ঝঢ়বপরধষ ঈধৎব ঘবনিড়ৎহ টহরঃ) নামমাত্র সচল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর, সি-প্যাপ (ঈচঅচ) মেশিন, ইনকিউবেটর এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে চিকিৎসকরা একটু জটিল শিশু দেখলেই হাত গুটিয়ে নেন। তাদের একটই পরামর্শ-“দ্রুত ঢাকা বা কুমিল্লায় নিয়ে যান।”
অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা পৌঁছানোর ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার এই দীর্ঘ পথই অনেক নবজাতকের শেষ যাত্রায় পরিণত হয়। আবার কখনো চাঁদপুর সদর বা প্রাইভেট হাসপাতালে অযথা বিনা চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ করে ঢাকায় রেফার করা হলে রাতেই পথিমধ্যে বা ঢাকায় গিয়েও শেষ রক্ষা হয় না। চিকিৎসকরা তখন জানান যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অসহায় বাবা-মাকে তখন বুকফাটা কান্না নিয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।
চাঁদপুর সদর হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সেবার চিত্র আরও শোচনীয়। সরজমিনে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন লিখলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হয় না। ইনপেশেন্ট রোগীদের চিকিৎসায় নার্সদের ওষুধ প্রয়োগের কোনো লিখিত হ্যান্ডওভার পদ্ধতি বা বেডের পাশে সুনির্দিষ্ট তালিকা টাঙানোর নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। মৌখিক নির্দেশে চিকিৎসা চলার কারণে রোগীর সঠিক পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া, চাঁদপুর সদর হাসপাতালসহ জেলার কোনো হাসপাতালেই নবজাতকের ইকোকার্ডিগ্রামের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অথচ কোনো কিছু বিবেচনা না করেই অনেক সময় নবজাতকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যয়বহুল এনআইসিইউতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গলাকাটা বাণিজ্য সরকারি হাসপাতালে সিট ও পর্যাপ্ত এনআইসিইউ সংকটের সুযোগ নিচ্ছে শহরের অলিগলিতে গড়ে ওঠা নামসর্বস্ব প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। ভুয়া এনআইসিইউ বা আইসিইউর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেখানে চলছে অবাধ বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব বেসরকারি ক্লিনিকে ২৪ ঘণ্টা কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ (ঘবড়হধঃড়ষড়মরংঃ) বা কনসালট্যান্ট থাকেন না। ডিপ্লোমাধারী বা অনভিজ্ঞ নার্স ও আয়াদের ওপর ভর করেই চলে নবজাতকদের জীবন রক্ষাকারী এই ইউনিটগুলোর কার্যক্রম। অথচ ঢাকার নামী-দামি হাসপাতালের চেয়েও চাঁদপুরের এসব মানহীন ক্লিনিকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়।
ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়া এক ভুক্তভোগী বাবা জানান, “ঢাকার মানসম্মত একটি হাসপাতালের এনআইসিইউ চার্জ যেখানে সাড়ে ছয় হাজার টাকা, সেখানে চাঁদপুরের মানহীন এনআইসিইউতে সাড়ে আট হাজার থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি ফি নেওয়া হয়।”
সন্তান হারানো মতলবের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাচ্চার সামান্য শ্বাসকষ্ট ছিল। সরকারি হাসপাতালে এনআইসিইউ না পেয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিলাম। দুই দিনে ৪০ হাজার টাকার বিল করল। কিন্তু বাচ্চার অক্সিজেন স্যাচুরেশন যখন ৪০-এ নেমে এল, তখন বলল ঢাকায় নিতে। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যে আমার সব শেষ হয়ে গেল।”
নবজাতক মৃত্যুর নেপথ্য কারণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতক মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জন্মকালীন শ্বাসকষ্ট (ইরৎঃয অংঢ়যুীরধ), প্রিম্যাচিউর বার্থ এবং মারাত্মক ইনফেকশন। সঠিক সময়ে সারফ্যাকট্যান্ট থেরাপি বা সি-প্যাপ সাপোর্ট পেলে অনেক শিশুই সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু চাঁদপুরে এসব আধুনিক সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে। এছাড়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত শিশু বিশেষজ্ঞ ও এনআইসিইউ বিশেষজ্ঞের পদগুলোর সিংহভাগই খালি। এই সংকট নিরসনে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন রক্ষায় অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল:
পূর্ণাঙ্গ এনআইসিইউ চালু: চাঁদপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অবিলম্বে আধুনিক ভেন্টিলেটরসহ অন্তত ৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ এনআইসিইউ ইউনিট দ্রুত চালু করতে হবে।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনা: যে সমস্ত প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভুয়া এনআইসিইউ সাইনবোর্ড দিয়ে প্রসূতি ও নবজাতকদের জীবন নিয়ে ব্যবসা করছে, সেগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন: জেলা পর্যায়ে দ্রুত নবজাতক রোগ বিশেষজ্ঞ (ঘবড়হধঃড়ষড়মরংঃ) ও প্রশিক্ষিত নার্স পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগীদের অকারণে ঢাকায় রেফার করার প্রবণতা কমে যায়। পরিশেষে, একটি শিশুর জন্ম একটি পরিবারের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু চাঁদপুরের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে সেই আনন্দ যেন আজ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার বেদনায় রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনে জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ সময়ের দাবি।