ধীরগতির সংস্কার কাজেও মেঘনার ভাঙন কমেছে

শহররক্ষা বাঁধ নিয়ে আশাবাদী চাঁদপুর শহরবাসী

এফএনএস (মিজানুর রহমান; চাঁদপুর) : | প্রকাশ: ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
শহররক্ষা বাঁধ নিয়ে আশাবাদী চাঁদপুর শহরবাসী

চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে চলমান সংস্কার কাজের ফলে ইতোমধ্যে নদীভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসায় তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

প্রমত্তা মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন থেকে চাঁদপুর শহরকে রক্ষায় ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শহররক্ষা বাঁধের সংস্কার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় মাদরাসা রোড লঞ্চঘাট থেকে পুরাণবাজার রণগোয়াল পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে নদীতে ফেলা হচ্ছে বালুভর্তি জিওব্যাগ এবং কংক্রিট ব্লক। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮১৫ কোটি টাকা। ১৯টি প্যাকেজে কাজ করছে ৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্পের তিন বছর অতিক্রম হলেও কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শহররক্ষা বাঁধের পুরাণবাজার অংশের অন্তত এক হাজার মিটার এলাকা মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়। এতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় শতাধিক বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক পরিবার হারায় তাদের বসতভিটা ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের এলাকায় নদীভাঙন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগে বর্ষা এলেই নদীপাড়ের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাতেন। ভয়াবহ ভাঙনে বহু পরিবার বসতভিটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা হারিয়েছে। বর্তমানে সংস্কার কাজ চলমান থাকায় ভাঙন কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। তিনি বলেন, এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা-গুণগত মান নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা।

স্থানীয় জেলে হুমায়ুন বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে তারা নদীপাড়ে বসবাস করছেন। জীবনে অসংখ্যবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। বহু বছর ধরে একটি স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়ে এলেও এখন সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে। তিনি শুধু পুরাণবাজার নয়, পুরো ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীরজুড়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের কারণে নদীপাড়ের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে তিন নদীর মোহনায় বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোতের কারণে মালবাহী ট্রলার, কার্গোসহ বিভিন্ন নৌযানের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ হলে নদীতীর সংরক্ষণের পাশাপাশি নৌপথও আরও নিরাপদ হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, নদীপাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ দ্রুত ও টেকসইভাবে সংস্কার করা না হলে পুরাণবাজারসহ আশপাশের ব্যবসায়িক এলাকা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। বর্তমানে বাঁধের দুর্বল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহন, নৌযান থেকে মালামাল ওঠানো-নামানো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি ব্যবসার স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দুর্বল বাঁধের কারণে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির চাপ বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থায়ী ও টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা গেলে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী পুরাণবাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে, পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম জানান, সংস্কার কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের কারণে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। কাজের গতি আরও বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন থেকে চাঁদপুর শহর, নদীপাড়ের জনপদ এবং পুরাণবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা পাবে।

এদিকে, চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প কাজের ধীর গতি ও কম অগ্রগতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। চাঁদপুর নদী বন্দর ব্যবসায়িক এলাকার ব্যবসায়ীদের পণ্য উঠানামা ঘাট গুলো এলোমেলো ভাবে ফেলে রাখা সিসি ব্লকের কারণে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। কবে নাগাদ এই ব্লকগুলো সারিবদ্ধভাবে বিছানো হবে তা অনিশ্চিত। নদী ভাঙন রোধে এবং বাঁধের সুরক্ষায় এই ধীরগতির ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্প কাজের ধীর গতি ও অবহেলার মধ্যে চলায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। শুধুমাত্র পুরান বাজার অংশের পশ্চিম শ্রীরামদি  রনাগোয়াল হতে হরিসভা মন্দির এলাকা পর্যন্ত শহর রক্ষা বাঁধের সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজের কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে