অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর বাগদান ভাঙন, মানসিক চাপে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু

এফএনএস (আদিল উদ্দিন আহমেদ; ভৈরব, কিশোরগঞ্জ) : | প্রকাশ: ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর বাগদান ভাঙন, মানসিক চাপে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু

ফারজানা আক্তার মিম কিশোরগঞ্জের ভৈরব শ্রীনগর ইউনিয়নের শ্রীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী। বাবা জীবন মিয়া একটি উপস্বাস্থ কেন্দ্রের নৈষপ্রহরী। বাবা হাসপাতালের পাহাড়াদার তার মেয়ের ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। তার বাবাকে ডাক্তার হতে গেলে কি পড়ালেখা করতে হয়, কতটুকু পড়তে হবে, কত বছর লাগে, কত খরচ হয় এইসব বিষয় নিয়ে খুটিনাটি নিয়ে প্রায়ই বাবাকে প্রশ্ন করতো মিম। 

নৈষপ্রহরী বাবা, মেয়ের স্বপ্নকে কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন, পড়াশুনার প্রাইভেট খরচ, মেয়ের আশা পূরণের জন্য নৈষপ্রহরীর পাশাপাশি দিনের বেলায় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত, গ্যারেজ থেকে অটো- রিক্সা ভাড়া নিয়ে বাড়তি প্রাইভেট খরচ ও সংসারের যোগান দিতে অটো রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। জীবন মিয়ার এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকুরী নিয়ে রামু সেনা নিবাসে কর্মরত আছেন। দুই মেয়ের মধ্যে মিম প্রথম ও ২য় মেয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়াশোনা করে।

মিম পঞ্চম শ্রেণীতে ৪.৮৫ পেয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের স্কাউটে নাম লেখাই। সত্তম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তির্ণ সময় ৫৫ জন ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে মেধায় ৫ম স্থান অর্জন করে মিম। ১-২ বছরের মধ্যে বিদ্যালয়ের স্কাউটের মধ্যে স্কাউটের লিডার নির্বাচিত হয়।

এলাকাবাসীর জানান, উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়ের শ্রীনগর গ্রামে চলতি বছর খোকন মিয়া নামে এক ঘটক একই গ্রামের জীবন মিয়াকে বলে ইউরোপের ইতালি প্রবাসী এক ছেলে আছে। ছেলে ভাল টাকা-পয়সা রোজগার করে। তোমার মেয়ে পড়াশোনা করুক তারমধ্যে ছেলের ইতালি গ্রীন কার্ড পেতে বেশ সময় লাগবে। ভালো ছেলে হাত ছাড়া উচিত না। খোকন মিয়া এই প্রস্তাবে মেয়েকে বুঝিয়ে চলতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রামের পশ্চিম পাড়ার দুলাল মিয়ার ছেলে পাবেলের সাথে আংটি পড়িয়ে বাগদান সম্পন্ন হয়। এই ঘরুয়া অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের ৩৫জন আত্বিয়স্বজন কে আপ্বায়িত করা হয়।

এরমধ্যে ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আযহা ও বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠানে মিমকে শখ করে হবু শুশুর পাভেলদের বাড়ীতে বেড়াতে নেওয়া হত। আংটি বদলের পর ভালই চলছিল ৪/৫ পাঁচ মাস। এর ভিতর হবু স্বামীর সাথে কথা বলতে পাভেল মিমকে এন্ড্রয়েড ফোন কিনে দেই। পাভেল একদিন মিমকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাগে নগ্ন দেখার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দেয়। পাভেল আরও বলে  কাপড় খুলে তার মোবাইলে নগ্ন শরীর ভিডিও করে পাঠাতে। কয়েকদিন করুচির প্রস্তাবের পর মিম রাজী না হওয়ায় তার সাথে পাভেলের উচ্চ স্বরে বাক-বিতন্ডা হয়। মিম পাভেলের কুৎসিত কথাবার্তা তার মাকে জানায়।  

এই দিকে পাভেলের অনৈতিক প্রস্তাবে তার হবু বউ রাজী না হওয়ায় পাভেল তার বাবা দুলালকে বলে তার দেওয়া মোবাইল ফোন ফেরত প্রদান করিতে। মাঝে মাঝে দেওয়া ২-৩ হাজার টাকা ফুচকা চটপটি খাওয়ার জন্য আনুসাঙ্গিক ৪-৫ মাসে প্রসাধনি ও পোশাক বাবদ ৬২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে যা সব টাকাই ফেরত আনতে বলেন। প্রয়োজনে আত্বীয় নষ্ট করে বাগদানের আংটি ও ফেরত চান। 

 ছেলে পাভেলের কথায় দুলাল মিয়া মিমের মা বাবার কাছে আংটি, মোবাইলসহ যাবতীয় খরচ বাবদ ৬০ হাজার টাকা দাবী করেন। এক পর্যায়ে ছেলের হবু বউকে শরীরে দুলাল মিয়া চর বসিয়ে দেন।  চলতি সপ্তাহে খোকনের মাধ্যমে শালিষ বৈঠক হয়। পরে গত রবিবার মিমদের বাড়ীর জালাল মিয়া ঘরে বিভিন্ন সময়ে খরচ বাবদ হাওলাত টাকা, নুপুর বানানোর টাকা ও ফুচকা চটপটি বাবদ বিভিন্ন সময়ে দেওয়া দাবী বাবদ নগদ ২৫ হাজার টাকা দুলাল মিয়ার হাতে ফেরত দেওয়া হয়। এ সময় বাগদানের আংটি ও মোবাইল ফেরত প্রদান করা হয়। এ সময় জালাল মিয়ার ঘরে উপস্থিত ছিলেন জালাল মিয়া, ঘটক খোকন ও গ্রামের জাকির হোসেন এবং মিমের বাবা জীবন মিয়া। 

বাগদানের আংটি ফেরত ও টাকা পয়সার ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিমের ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী ও বান্ধবী সহ গ্রামের লোকজন জেনে যায়। লজ্জায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় মিম। গ্রামের লোকজন বিভিন্ন মানুষের কথা ও অপবাদ মনে করে গত বুধবার রাত ৯ টাই তার নিজ ঘরে বিষ পান করে মিম। মা-বাবা প্রতিবেশীরা প্রথমে মিমকে উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে পরে তার শারিরিক অবস্থা অবনতি হলে বাজিতপুর জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে মিম মৃত্যুবরণ করেন। পরে বাজিতপুর থানা পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাস মর্গে পাঠাই। গত কাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে নিজ গ্রামে লাস দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়। একই বাড়ীর জীবন মিয়ার মামা জালাল উদ্দিন জানান, শান্ত স্বভাবের ছিল মিম। ছোটবেলায় সে মাদরাসায় পড়াশুনা করতো। কয়েক বার আল-কুরআন খতম করেছে। বোরকা ছাড়া কোথাও বের হত না। এই মেয়েকে বলে মোবাইলে তার শরির দেখাতে কাপড় খুলে ভিডিও ছবি দিতে। রাজী না হওয়ায় জামাই শুশুর তারা দুইজনেই ক্রুদ্ধ হয়েছে। 

জাকির হোসেন বলেন আমাদের কয়েকজনের উপস্থিতে ২৫ হাজার টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণের আংটি ছেলের বাবাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। ছেলের বাবা দুলাল মোবাইলের মাধ্যমে কথা হলে বলেন, আমরা খুব শখ করে মিমের হাতে আংটি পড়িয়ে ছিলাম। মিম ও ভালো মেয়ে ছিল। মিমের শরিরে চর দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন তিনি। 

শ্রীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ খলিলুর রহমান জানান, মিম মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ওকে স্কুলের স্কাউটের লিডার মনোনীত করা হয়েছিল। ওর বাগদানের কথা স্কুল কর্তৃপক্ষ কারো জানা ছিল না। আজ শুক্রবার তার মৃত্যুর খবর আমরা পাই। সমাজের বাল্য বিয়ের প্রভাবকে তিনি দায়ী করেন। বাবা-মা সচেতন হলে আজ আমরা মিমকে হারাতে হত না। 

মিমের বাবা জীবন মিয়া বলেন, আমার মেয়ে এভাবে জীবন দিবে তা আগে ভাবেনি। আমি হাসপাতালে নৈষপ্রহরী, মেয়ের স্বপ্ন ছিল হাসপাতালের একজন ডাক্তার হবার। আজ সব স্বপ্ন শেষ। আমার মেয়ের মৃত্যুর প্ররোচনায় যারা জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি তিনি দাবী করেন। ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ টায় সময় জানান, মিমের মৃত্যুর খবর শুনেছেন তিনি। যদি পরিবার থেকে কোন লিখিত অভিযোগ করে তাহলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন তিনি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে