৩ বছরেও

চালু হয়নি পাঙ্গাহাটে ২কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সবজীর মার্কেট

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
চালু হয়নি পাঙ্গাহাটে ২কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সবজীর মার্কেট

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের পাঙ্গা এলাকা সবজির রাজ্য বলে পরিচিত। এ অঞ্চল বেশ চওড়া(উঁচু) হওয়ায় সব মৌসুমে বেগুন, মুলা, আলু, পটল, করলা, শষা ঝিঙা, লাউসহ সব ধরনের শাক-সবজির বিপ্লব ঘটে। কিন্তু এসব সবজি সঠিক সময়ে বিক্রি করতে না পেরে কৃষকদের লোকসান গুণতে হয়। আর এসব সবজি সংরক্ষনের জন্য এলাকায় কোন কৃষি হিমাগার বা বিক্রয় কেন্দ্রও নাই। তাই তাদের সবজি নিয়ে দুর-দুরান্তের হাট-বাজারে যেতে হয়। কৃষকদের দুঃখ লাঘবের জন্য কুড়িগ্রাম এলজিইডি ২০২১ সালে পাঙ্গাহাটে ৩০ শতাংশ জমির ওপর গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ঈজগওউচ) আওতায় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ২০২৩ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ভবনে শাক-সবজির বিক্রির জন্য ১৮টি দোকান ও ৬টি বিক্রয়কেন্দ্র(আরত) ও পানি, বিদ্যুৎ এবং শৌচাগারসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। কিন্তু মার্কেট ভবনটি গত তিন বছরেও চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভবনটি কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন স্থানীয়রা। 

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ঈজগওউচ) আওতায় নির্মিত ভবনের চারপাশে আগাছা ও অপরিচ্ছন্নতা। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েক জায়গায় পলেস্টার ধসে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে বৈদ্যুতিক সুইচ। ভবনের ভেতর মাদক সেবনের চিহ্নও দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ বাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করা এবং কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য উন্নত বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করা। তবে নির্মাণের প্রায় তিন বছর পরও ভবনটি চালু না হওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঙ্গাহাটে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম তুলনামূলক কম। উপজেলা সদর রাজারহাট বাজার মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় অনেক ক্রেতা সেখানে কেনাকাটা করতে যান। এ ছাড়া পাঙ্গা হাটের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বড় একটি অংশ মাঠ থেকেই পাইকাররা কিনে নেন। ফলে স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্যের বেচাকেনাও সীমিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মার্কেট ভবন নির্মাণের আগে বাজারের বিদ্যমান ব্যবসা ও ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ভবন নির্মাণের জন্য আগে বাজারের প্রায় ৩০টি দোকান ভেঙে দেওয়া হয়। এতে কয়েকজন ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্যত্র চলে যান। স্থানীয় ব্যবসায়ী মফিজুল মিয়া বলেন, “এই ব্লিডিংয়ের জন্য দুইবার মোর পাকা দোকান ভাঙ্গি দিছে। প্রথমবার দোকানটা ভাঙ্গি মেছাকার করি দিলো। ছয় মাস গেইল কাম শুরু করিল না। ফির আশি হাজার টাকা খরচ করি পাকা ঘর করছিনোং। এক মাস ব্যবসা নাই করতে ঘরটা মোর ফির ভাঙ্গি দেইল। মোর মেলা টাকা লস হইছে এই ব্লিডিংয়ের জন্যে।”

শাক-সবজি ব্যবসায়ী মো. নূরনবী ইসলাম বলেন, পুরো বাজারে শাক-সবজি বিক্রির দোকান মাত্র দুটি। সারাদিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মতো বিক্রি হয়। তাঁর ভাষ্য, এলাকার অধিকাংশ সবজি মাঠ থেকেই পাইকাররা কিনে নেন। আর কৃষকেরা অবশিষ্ট পণ্য রাজারহাটে নিয়ে বিক্রি করেন।

ব্যবসায়ী মো. মাসুম রানা মন্ডল বলেন, ক্রেতা কম হওয়ায় কৃষকেরাও পাঙ্গা হাটে আসতে চান না। তাঁর মতে, মার্কেটটি অন্যত্র বা রাজারহাট সদর বাজারে নির্মাণ করা হলে বেশি উপকার হতো। এ ছাড়া ভবনের অধিকাংশ দোকান দোতলায় হওয়ায় ক্রেতারা সেখানে উঠতে আগ্রহী নন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহ-জামাল বলেন, “এই ভবন পাঙ্গাহাটে বানেয়া সরকার সোগ টাকা নষ্ট করছে। দোকানদাররা বিকেল বেলা দোকান দেয়, বাজারোত মাইনষে নাই। এটে হাকাউ এই ভবনটা করছে।” পাঙ্গা হাটের হাট কমিটির সদস্য মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ভবনটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে না পড়ার জন্য প্রায় ছয় মাস কয়েকটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে প্রায় ১৮ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। পরে বিল পরিশোধ করতে না পারায় কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তিনি বলেন, “এই ভবন থেকে কোনো আয় নেই। এজন্য ব্যয় করতেও আমরা রাজি নই। এই ভবন আর চালু হওয়ার সুযোগ নেই।”

তবে ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা  উপজেলা প্রকৌশলী মো. এজাহারুল হক বলেন, নির্ধারিত নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ভবনটি হাট কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে