প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের অর্ধলক্ষাধিক সেচযন্ত্রকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। ওই লক্ষ্যে কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ওই প্রকল্পের আওতায় দেশের ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র সৌরচালিত করা হবে। তাছাড়া ২৫ হাজার সৌর সেচযন্ত্রে বসানো হবে নেট মিটারিং ব্যবস্থা। যাতে সেচের কাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয় করা যায়। নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যমান সেচযন্ত্রসমূহকে সৌরশক্তি চালিত সেচযন্ত্রে রূপান্তরকরণ প্রকল্পে ৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আগামী ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত ৪ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। আর প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে দেয়া হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা কমিশন এবং বিএডিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যমান সেচযন্ত্রসমূহকে সৌরশক্তি চালিত সেচযন্ত্রে রূপান্তরকরণ প্রকল্পটি দেশের ৮ বিভাগের ৫৬ জেলার ৩৪৯টি উপজেলায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় তা অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ২ কিউসেক ক্ষমতার ২৫০টি ডিজেলচালিত এলএলপি, ১ কিউসেক ক্ষমতার ৫৫০টি এলএলপি এবং ০.৫ কিউসেক ক্ষমতার ৫০ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি ১০০টি বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপও সৌরশক্তিতে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ওসব সেচযন্ত্রের মাধ্যমে বছরে দুই লাখ ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে। তাতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৫ টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭১ শতাংশ সেচপাম্প ডিজেলে চলে। আর দেশে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ৮০৭টি। কিন্তু গ্রিড বিদ্যুতের সুবিধা না থাকায় প্রতিবছর সেচ মৌসুমে ওসব সেচযন্ত্রের জন্য আমদানি করতে হয় বিপুল পরিমাণ ডিজেল। কিন্তু প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ হাজার ৯০০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা হলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হবে। তাতে বছরে সাশ্রয় হবে ৩৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। আর ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমলে কৃষকদের সেচ খরচও কমে আসবে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা সরবরাহে সংকট হলেও সেচব্যবস্থায় তুলনামূলক কম প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় নেট মিটারিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে। সেজন্য ২৫ হাজার সৌরচালিত সেচযন্ত্রে ওই ব্যবস্থা বসানো হবে। ফলে সেচের প্রয়োজন না থাকলে বা সেচ মৌসুমের বাইরে সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেয়া সম্ভব হবে। এভাবে প্রতিবছর আয় করা সম্ভব হবে প্রায় ১৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
সূত্র আরো জানায়, সরকার প্রকল্পের আওতায় মোট ১৭ হাজার ১৬০টি সেচক্ষেত্রকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। তার মাধ্যমে প্রতিবছর ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে দেয়া হবে সেচ সুবিধা। আর তাতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৫ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি সৌরপাম্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কৃষক-কিষানিদের দেয়া হবে প্রশিক্ষণও। প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে মোট ৪৮০ ব্যাচে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাছাড়া বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। একই সাথে সরকারের সৌর প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষণাগার নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০-এ ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ধাপে ধাপে সৌরচালিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের সঙ্গেও প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও অনেক এলাকায়ই সেচের সময় বিদ্যুৎ ঘাটতি ও নিম্ন ভোল্টেজের সমস্যায় বিদ্যুত্চালিত পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে সৌরশক্তি সেচের একটি বিকল্প ব্যবস্থা হবে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, সৌরবিদ্যুিভত্তিক সেচ প্রকল্প একটি ভালো উদ্যোগ। তেলের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। তবে শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না। কৃষকদের উৎসাহিত করতে ভর্তুকি এবং সৌরচালিত পাম্পের বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। এরই মধ্যে ব্যবহৃত কিছু সৌরপাম্পে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।