দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ফের চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) তাকে আদালতে হাজির করে আরও সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেনের আদালতে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন নজরুলকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে নজরুল ইসলামকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা জানতে তাকে আরও বিস্তারিত ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। একই মামলায় তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছিল। রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার মাকছুদাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তদন্তভার পরে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে মামলার আরেক আসামি মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং ওবায়দুর রহমানকে আসামি করেছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত জুনে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। মরিয়মের বয়স ছিল ১৯ বছর। বিয়ের পর তিনি সংসদ ভবনের বিপরীতে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন।
এজাহারে মরিয়মের বাবা অভিযোগ করেছেন, বিয়ের পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা তার মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে নজরুল ফোন করে তাকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তার বাবা।
পুলিশ ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। ওই রাতেই গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। (Daily Adin)
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের সময় মরিয়মের বিছানার ওপর তার লেখা কয়েকটি চিরকুট পাওয়া যায়। সেসব লেখায় সম্পর্ক, বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক কষ্ট এবং স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে হতাশার কথা উঠে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি লেখায় তিনি নিজেকে বিশ্বাস করে সম্পর্কে জড়ানোর পর প্রতারিত হওয়ার কথা লিখেছেন। আরেকটিতে অন্য নারীর স্বামীকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। এসব চিরকুটের ভিত্তিতেই পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো এক সময় মরিয়ম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।
মামলার ঘটনাপ্রবাহের আগে গত ২০ জুলাই ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করা হয়েছিল।
পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই এক ফেসবুক পোস্টে ওই তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। এরপর জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়ে ২২ জুলাই তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বিরোধী দল পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্তে এখন গাজী নজরুল ইসলামকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আদালত সাত দিনের আবেদন থেকে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।