দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের শুরুতেই ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেওয়া প্রেস ব্রিফিংয়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার করা রিট হাইকোর্টের কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি কার্যতালিকা থেকে ডিলিট করে দেন। রিটটি শুনানির জন্য মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় ১১২ নম্বর ক্রমিকে ছিল।
এর আগে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন আসিফ মাহমুদ। তার পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা আবেদনটি করেন। রিটে দুদক চেয়ারম্যান, কমিশনের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং সহকারী পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়।
রিটে অভিযোগ করা হয়, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। আসিফ মাহমুদের দাবি, কোনো অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা অনুসন্ধান শেষে পাওয়া ফলাফলের বিষয় হতে পারে, অনুসন্ধান শুরুর সময় এমন বক্তব্য দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার দুদকের নেই।
রিট আবেদনে ২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের দেওয়া দুটি প্রেস ব্রিফিংয়ের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করা হয়। এসব ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় এবং ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল।
আবেদনে আরও বলা হয়, ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের সচিব গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ওই বক্তব্যকে ‘স্লিপ অব দ্য টাং’ বা মুখ ফসকে বের হয়ে যাওয়া কথা হিসেবে উল্লেখ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বক্তব্যটি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছিলেন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়। তবে এ বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট প্রত্যাহার গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়নি বলে দাবি করেন আসিফ মাহমুদ।
রিটে বলা হয়, এরপর ১০ সেপ্টেম্বর দুদককে আইনি নোটিশ দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের একজন সহকারী পরিচালক আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, জেলা প্রশাসক পদায়ন, ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার এবং বিদেশে অর্থপাচারসহ আরও কয়েকটি অভিযোগের কথা বলা হয়।
আসিফ মাহমুদের দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অসত্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব বাতিলের বিষয়টি প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর মন্ত্রণালয়ের আদেশে হয়েছে বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ১৫০ জন সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি তার উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের প্রায় পাঁচ মাস পর, ১১ মে ২০২৬ কার্যকর হয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়। তিনি পদত্যাগ করেন ১১ ডিসেম্বর ২০২৫। ফলে ওই পদোন্নতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই বলে রিটে বলা হয়েছে।
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণার পর তার সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন এবং ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানোর উদ্দেশ্যে এসব ব্রিফিং করা হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা মর্যাদা ও সুনামের সুরক্ষা এবং ‘তথ্য অবমুক্তকরণ নীতিমালা, ২০১১’-এর পরিপন্থি বলেও আবেদনে দাবি করা হয়।
রিটে চলমান কোনো অনুসন্ধান বা তদন্তের বিষয়ে দুদককে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রেস ব্রিফিং থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করে একই গুরুত্ব দিয়ে তা প্রকাশের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
মঙ্গলবারের শুনানিতে আসিফ মাহমুদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন, আইনজীবী ইউসুফ আলী ও জহিরুল ইসলাম মূসা। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ইমাম হোসেন তারেক, জসীম সরকার ও ব্যারিস্টার মো. শিহাব উদ্দিন খান।
রিটটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আদেশের অর্থ মামলাটির বিষয়ে চূড়ান্তভাবে আদালতের কোনো রায় দেওয়া হয়েছে, এমনটি নয়। আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মূসার ভাষ্য অনুযায়ী, অবকাশকালীন বেঞ্চে রিটটি কার্যতালিকা থেকে ডিলিট হয়েছে এবং অবকাশের পর নিয়মিত বেঞ্চে এটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। শুরুতে তিনি শ্রম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। একই বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন।