পোলট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতের ফিড বা প্রাণিখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে চরম সংকটে পড়েছেন দেশের খামারিরা। গত কয়েক দফায় ফিডের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার পাশাপাশি ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা। খাবারের পেছনেই যেখানে মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় হয়, সেখানে কাঁচামালের অগ্নিমূল্যের কারণে অনেক খামারি দৈনন্দিন ফিডের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পোলট্রি ও গবাদিপশুর কাঙ্ক্ষিত ওজন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন চক্রের সময়সীমা। কাঙ্ক্ষিত বাজারদর না পেয়ে ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে ইতিমধ্যেই অনেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন, আর প্রান্তিক খামারিদের একটি বড় অংশ খামার গুটিয়ে ফেলার আশঙ্কায় দিন গুনছেন। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামালগুলোর প্রায় সবকটির দামই গত এক মাসে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে ফিডের অন্যতম প্রধান উপাদান ভুট্টার বাজারে। মৌসুমে কেজিপ্রতি ভুট্টা ২৮-২৯ টাকায় পাওয়া গেলেও সমপ্রতি তা বেড়ে ৩৮-৪০ টাকায় ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতি টন ভুট্টার দাম ২৩৫-২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে কেজিপ্রতি ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা হয়েছে। এছাড়া সয়াবিন মিলের দাম কেজিপ্রতি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা, ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে ৩৯ টাকা, ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান (উঙজই) ২৬ টাকা থেকে ৩৩ টাকা এবং সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। অন্যান্য প্রোটিন উৎসের দামও একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ফিডের কাঁচামালের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামাকে দায়ী করছেন শিল্পমালিকরা। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর বাড়তি এলসি ও পরিবহন খরচের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে ফিডের খুচরা দামে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ ফিড মিলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। একই সাথে স্থানীয় বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভুট্টা ও অন্যান্য কাঁচামাল মজুত করার অভিযোগও তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। এক মানসম্মত ফিড তৈরির মোট খরচের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই কাঁচামাল ক্রয়ে চলে যাওয়ায়, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ফিডের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে বাজারে ৫০ কেজির পোলট্রি ফিড বস্তাপ্রতি সর্বোচ্চ ৩,৬৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং ১,৩০০ টাকার চালের কুঁড়া বা ব্র্যানের বস্তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৮০০ টাকায়। ফিডের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল পোলট্রি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; মাছ ও গবাদিপশুর খাবারের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় সামগ্রিক প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। বাজারে ইতিমধ্যেই ডিম, মুরগি ও মাছের দাম বাড়তে শুরু করেছে। খামারিরা বাজারে তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন পর্যায়ে মুনাফা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক খামারিরা বাজার থেকে ছিটকে পড়লে অদূর ভবিষ্যতে মাংস, ডিম, দুধ ও মাছের সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা সর্বস্তরের ভোক্তার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং প্রাণিসম্পদ খাতকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার জোর তাগিদ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চালের কুঁড়া (জরপব ইৎধহ) ও ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের মতো স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালের অভ্যন্তরীণ চাহিদা আগে মেটানো নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে রপ্তানি নীতিতে সাময়িক ভারসাম্য আনতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে আমদানি পর্যায়ে সাময়িকভাবে ভ্যাট, কর ও শুল্ক কাঠামো সহজ করার উদ্যোগ নিতে হবে। অসাধু চক্র যাতে ভুট্টা বা অন্যান্য কাঁচামাল অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং ফিড মিলগুলোর উৎপাদন খরচ কমাতে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধানের মতে, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ আগে দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারির উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ডিম-মুরগির দামও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।