বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামানকে রিমান্ড দেওয়ার মাধ্যমে যে আচরণ করা হয়েছে তা ন্যাক্কারজনক বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার জন্য দুজনকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষই স্বীকার করেছে সেখানে অব্যবস্থাপনা ছিল। সেই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলে আখতারুজ্জামান যথার্থ কাজই করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এই মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে রিমান্ডের আদেশ বাতিল করে তাকে মুক্তি দিতে হবে।
শনিবার (২ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয় ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ অক্টোবরের ঘটনায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলা এবং রিমান্ডে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিমানবন্দরে প্রায় ৩৪ জন সংসদ সদস্যসহ অনেক নেতাদের অবতরণের পর লাগেজ, জমজমের পানি ও ট্রলি না পেয়ে তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। ভিআইপি যাত্রী হিসেবে সেখানে উত্তেজিত হয়ে কর্তৃপক্ষকে শক্ত কথা বলা নাগরিক অধিকার। আখতারুজ্জামান সেই অধিকারই প্রয়োগ করেছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মামলার এজাহারে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়া, আঘাত ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ওই সময় আমাদের এমপি কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেছেন, আখতারুজ্জামান কারও গায়ে হাত তোলেননি বা কাউকে নাজেহাল করেননি। তিনি যা বলেছেন, তা ভিডিওতেও দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার জন্য দুজনকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষই স্বীকার করেছে যে, সেখানে অব্যবস্থাপনা ছিল। সেই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলায় আখতারুজ্জামান তো যথার্থ কাজই করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এই মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে রিমান্ডের আদেশ বাতিল করে তাকে মুক্তি দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আখতারুজ্জামান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সাহসী মানুষের মতো নিজের বাসা থেকে স্বেচ্ছায় পুলিশের সঙ্গে গেছেন। তাকে গ্রেপ্তারের কারণ শুধু বিমানবন্দরের ঘটনা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আখতারুজ্জামানকে হেলমেট পরানো হয়েছে। কারাবিধি অনুযায়ী দুর্ধর্ষ অপরাধী, খুনি, ডাকাত কিংবা পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন আসামিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আখতারুজ্জামান কি দুর্ধর্ষ ডাকাত বা খুনি? তিনি তো স্বেচ্ছায় পুলিশের সঙ্গে গেছেন। তাহলে কেন তাকে হেলমেট পরানো হলো? দুই-তিন দিনের ঘটনায় যারা অপরাধী, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। অথচ একজন নিরপরাধ মানুষকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আজকাল সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের কিছু মন্ত্রী-এমপি জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের বিরুদ্ধে সুর মিলিয়ে কথা বলছেন। জামায়াত-শিবিরকে ‘গুপ্ত’ বলা হচ্ছে। একজন দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির মুখে এ ধরনের কথা মানায় কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, জামায়াতকে গুপ্ত ও স্বাধীনতাবিরোধী বলা হলে এসব বক্তব্য আপনাদের বিরুদ্ধেই যাবে। কারণ ২০-২২ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে রাজপথে ছিল। চারদলীয় জোটে তারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। তখন জামায়াতকে গুপ্ত বলা হয়নি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। জামায়াত তখন কোনো মন্ত্রিত্ব বা পদবি নেয়নি। বিএনপিকে সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছিল। তখন জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী বা রাজাকার বলা হয়নি কেন? আপনার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপনার মা বেগম খালেদা জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রাজনীতি করেছেন। তাদের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে নিয়ে সরকার পরিচালনা করা হয়েছে। এখন জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী বলার আগে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে তাকানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, আপনার মা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবিতে বক্তব্য দিয়েছেন। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতিও সংসদে মাওলানা নিজামীর প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে এখন আপনারা কেন ভিন্ন কথা বলছেন?
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার ও গণহত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করলে এর রাজনৈতিক দায় আপনাদেরই নিতে হবে। ২০২৪ সালের আগে আপনারা এসব কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ চলে যাওয়ার পর এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় জামায়াতকে আক্রমণ করা হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের কথার এত মিল কেন? দিল্লির সঙ্গে গোপনে কোনো যোগাযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতকে এক করে দেখবেন না। জামায়াতে ইসলামী দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য রাজনীতি করছে।
তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জামায়াতকে ‘গুপ্ত’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বা ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জনগণই বিচার করবে কোনটি ঠিক, কোনটি ভুল। সেই ফয়সালা জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করলে জনগণ তার জবাব দেবে। বিরোধী দল ও সরকারি দল মিলে দেশের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সরকার ভালো কাজ করলে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করবে, আর দেশবিরোধী কাজ হলে তার বিরোধিতা করবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী অপরিণত রাজনৈতিক দল নয়। দেশের স্বার্থে রাজনীতি করছে। সরকারের সঙ্গে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি বা দিল্লির স্বার্থের কোনো মিল থাকলে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তার বিরোধিতা করা হবে।