ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন বা নতুন চুক্তি সম্পন্ন করার আশা করছে বাংলাদেশ। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনা এবং শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজের দৃশ্যমান কাজ আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে শুরু এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রস্তুতি শেষ করে ২০২৭ সালে মূল কাজ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘রিথিংকিং ওয়াটার ফিউচারস: ইয়ুথ লিডারশিপ, জাস্টিস অ্যান্ড কোঅপারেশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবেও গঙ্গা চুক্তি, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। এর আগে নতুন ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছে। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকের ভিত্তিতে ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী।
এ্যানি বলেন, শুধু পুরোনো চুক্তি নবায়ন নয়, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ নতুন বা সংশোধিত চুক্তির দিকে এগোতে চায় সরকার। এর অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১৯৭৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়েছিল, তাতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সেই ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এবার নতুন চুক্তিতে আগের ওই নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান পানিসম্পদ মন্ত্রী।
তিনি বলেন, গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি শুধু পানির পরিমাণ দিয়ে দেখলে হবে না। কখন কত পানি প্রবাহিত হচ্ছে, প্রবাহের পরিবর্তনশীলতা, বন্যা ব্যবস্থাপনা, পলি, নদীর প্রতিবেশ এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় শুষ্ক মৌসুমের পানি নিশ্চিত করতেও কার্যকর গ্যারান্টি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
জেআরসির কারিগরি দল এ নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কারিগরি পর্যায়ের কাজ শেষ হলে অবশিষ্ট বিষয়গুলো মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা করা হবে। সরকারের পানি কূটনীতি সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রমাণ, তথ্য বিনিময় এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক বদ্বীপ ও ভাটির দেশ। দেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও খরা এখন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা হয়ে উঠেছে। এসব মোকাবিলায় প্রচলিত পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পানি কূটনীতি, অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা, জলবায়ু সহনশীলতা, অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ন্যায্য অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টিও তুলে ধরেন এ্যানি। তিনি বলেন, আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদের ন্যায্য ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্য বিনিময় এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম। একই ধরনের বন্যা, লবণাক্ততা ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে জোট গড়ে তুলতে হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনাকেও সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য তিস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুষ্ক মৌসুমে সেখানে তীব্র পানির সংকট এবং বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙনের সমস্যা দেখা দেয় বলে জানান তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান এ্যানি। তিনি বলেন, স্টাডির ভিত্তিতেই মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এ কাজে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, তিস্তা একটি খরস্রোতা নদী এবং উজান থেকে পানির প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের মানুষ নানা সংকটে রয়েছে। মহাপরিকল্পনা নিয়ে অনেক আলোচনা ও সেমিনার হলেও এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কারিগরি সমীক্ষা। সে লক্ষ্যেই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তাঁর আশা, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করে একই বছরে তিস্তা প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যাবে। তবে এত বড় প্রকল্পের স্টাডি রাতারাতি বা এক-দুই মাসে শেষ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
পদ্মা ব্যারাজ নিয়েও সময়সূচি জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ইতোমধ্যে একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে এর দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে বলে সরকার আশা করছে।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বড় প্রকল্প উল্লেখ করে এ্যানি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজের স্টাডি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এর সমীক্ষার কাজ চললেও পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করে কাজ হাতে নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তিস্তার মতো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অতীতে পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ শেষ করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। বর্তমান সরকার নিজস্ব উদ্যোগে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিয়ে প্রক্রিয়াটি শেষ করে প্রকল্পকে বাস্তব রূপ দিতে চায়।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এ্যানি বলেন, এসব নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাঁদের স্বার্থ ও চাপই সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
পানি ব্যবস্থাপনায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। তরুণ গবেষক, শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, কূটনীতিক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও উদ্যোক্তাদের পানি কূটনীতি, আন্তর্জাতিক পানি আইন, জিআইএস, জলবায়ু বিজ্ঞান ও সংঘাত নিরসনের মতো বিষয়ে দক্ষ করে তোলার আহ্বান জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার কথাও বলেন।
সেমিনারে আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের পানি কূটনীতি শক্তিশালী করা, অংশগ্রহণমূলক শাসন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং পানি ব্যবস্থাপনায় তরুণদের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন।