খুলনার বাহাদুরের দখলবাজীতে অতিষ্ট সাধারণ মানুষ

দখল, চাঁদাবাজির অপকর্মের দায় দল নেবে না: এমপি আমির এজাজ

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
দখল, চাঁদাবাজির অপকর্মের দায় দল নেবে না: এমপি আমির এজাজ

খুলনার বটিয়াঘাটার ১নং জলমা ইউনিয়নের অলি-গলি, পাড়া মহল্লায় বাহাদুর মুন্সীর পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। চব্বিসের ৫ আগষ্টের আগে এই মানুষটিকে এলাকার কেউ চিনতো না। জমি দখল, সরকারী খাল দখল, বালু মহাল দখল, চাঁদাবাজী, কমিশন বানিজ্য করে হয়েছেন কোটিপতি। পেশীশক্তি ও অর্থের জোরে বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ট পরিচয় দিয়ে অপকর্ম করে যাচ্ছেন। তবে সংসদ সদস্য বলছেন  অপকর্মের দায় দল বহন করবেনা। আগামী ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে পোষ্টার ছাপিয়েছেন। তার দখলদারিত্ব ও নানা অপকর্মের কারণে এলাকাবাসী অতিষ্ট। বিব্রত স্থানীয় যুবদলের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। খুলনামহানগরীর রায়েরমহল এলাকার বাসিন্দা বিধবা নাছিমা হাসান অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী ইমাম হাসান বাচ্চু বেচেঁ থাকাকলে ২০১৫ সালের ৮ মার্চ  বটিয়াঘাটার রাঙ্গেমারী গ্রামে ১৪ শতক জমি (দাগ নং ২১৬৩) ক্রয় করে সেখানে  সেখানে বাউন্ডারী ওয়াল, আরসিসি ঢালাই দিয়ে দোকান নির্মাণ করেন। কিন্তু  ২০২৫ সালের একটি দলিল দেখিয়ে বাহাদুর মুন্সী জমিটির একাংশ দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে। 

তিনি বলেন, বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর গত ৫ অক্টোবর ওই জমি দখল করেন বাহাদুর। এঘটনায় তিনি জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে এমপি মামলা নং ৫০২/২৬ দায়ের করেন। ফলে আদালত শান্তি -শৃংখলা বজায় রাখার নির্দেশ দিলে তারা নির্দেশ না মেনে গত ১৩ অক্টোবর আমাকে ও আমার ছেলেদের হত্যার হুমকি দেয়। এঘটনায় বিধবা নাছিমা হাসান ওইদিন অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে তিন জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করলেও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া এলাকার বিভাস গোলদার অভিযোগ করে বলেন, চক্রাখালি বাজারে তার পৈত্রিক সম্পত্তিতে দোকান নির্মাণ করে তিনি ভাড়া দেন। চব্বিসের  আগষ্টের পর বাহাদুর মুন্সী ব্যক্তিগত অফিসের জন্য একটি দোকান ভাড়া নেন। এর কয়েকমাস পর বাহাদুর বলেন, এই দোকানগুলো তার নিজের, তার দলিল আছে। এভাবেই বিভাসের দোকান ঘর দখল নেয় মাহাদুর। 

জানতে চাইলে বিভাস গোলদার বলেন, ‘আমি হিন্দু মানুষ, কোন ঝামেলায় যেতে চাইনা’। এ কারণে মামলা-মোকদ্দমায় যাইনি। এছাড়া চক্রাখালী বাজারে আকরামের ৭টি দোকান দখল করে নিয়েছে বাহাদুর। তেতুলতলা এলাকার দরিদ্র মরিয়মের ২৫ শতক জমি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বাহাদুরের বিরুদ্ধে। ছয়ঘড়িয়া এলাকায় স্কুলের পাশে একটি দোনঘর দখলে নিয়ে সেখানে ব্যবসা করছে বাহাদুরের ভাই বাদশা। এরই পাশে হিন্দুদের জমি দখল করে ভ্যান গ্যারেজ, দোকান ঘড় ও ফাঁকা জমিতে প্লট করেছেন বাহাদুর বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় যুবদলের মাঠ পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বটিয়াঘাটা বাজারে ব্যবসায়িদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেন বাহাদুর মুন্সী ও তার লোকজন। এছাড়া ৫ আগষ্টের পর পশুর নদীর তেতুলতলা, পুটিমারি, কাতিয়ানাংলা ও তার আশপাশের এলাকার ‘বালু মহাল’ দখল করে নিয়ে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে বাহাদুর ও তার লোকজন। দলের ওই সূত্রটি জানায়, বাহাদুরের বিরুদ্ধে খোকন ও জাহাঙ্গীর হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি মামলা প্রভাব খাটিয়ে তুলে নিতে বাধ্য করেছেন। সূত্রটি আরো জানায়, জমি দখল, সরকারী খাল দখল, বালু মহাল দখল, চাঁদাবাজী ইত্যাদি ঘটনার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপ গত ৮ আগষ্ট রাতে বাহাদুর গ্রুপের সাথে প্রতিপক্ষের গোলাগুলিও ঘটনা ঘটে। বাহাদুরের ডান হাত হিসেবে খ্যাত বাদল একসময় ভ্যান চালাতো। তিনিও ৫ আগষ্টের পর অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। 

বটিয়াঘাটা সদর থানার যুবদল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে বাহাদুর নামের কাউকে আমরা চিনতাম না। হঠাৎ করেই তিনি পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছেন। তার বর্তমান কর্মকান্ড নিয়ে দল বিব্রত। তিনি বলেন, খুলনা-১ আসনটি উদ্ধার করতে বিএনপির প্রায় ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কাজেই আসনটি ধরে রাখতে হলে চাঁদাবাজ, দখলবাজদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এদিকে ইমাম হাসান বাচ্চুর ক্রয়কৃত জমি দশ বছর পর দখলে নেওয়া প্রসঙ্গে  যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির কাগজ পত্র সব ঠিক আছে। তাই আমি  কিনেছি ও দখল বুঝেনিছি। তিনি বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন এটারও তদন্ত চলছে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।  আমি  সঠিক ভাবে কাজ করেছি। আমি কোন আইন ভঙ্গ করি নাই। এছাড়া চা^দাবাজী, বালুমহাল দখলসহ নানা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দলের দুবিধাভোগীরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এদিকে যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সীর অপকর্মের অভিযোগ নজরে আনলে খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক আমীর এজাজ খান বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি দখল, চাঁদাবাজী ইত্যাদি অপকর্ম করে তার দায় দল নেবে না।

তিনি বলেন, আমার দীর্ঘদিরে রাজনীতে এলাকায় পরিচ্ছন্ন ইমেজ রয়েছে। কোন ভুমিদস্যু বা দুস্কৃতিকারীর কারণে এই ইমেজ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। দখলদারদের অবস্থান আমার কাছে নেই।

জানতে চাইলে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, বটিয়াঘাটাসহ চার উপজেলায় বিশেষ অভিযান চলছে। অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে জমি বা দখল সংক্রান্ত অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। সে কারণে কারো বিরুদ্ধে এধরণের কোন অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সাথে নিয়েই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে