১৩ বছরে সড়কে ঝরেছে ১ লাখ ২৫ হাজার প্রাণ, আহত ১ লাখ ৭৬ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
১৩ বছরে সড়কে ঝরেছে ১ লাখ ২৫ হাজার প্রাণ, আহত ১ লাখ ৭৬ হাজার
ছবি: সংগৃহীত

দেশে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সাড়ে ১২ বছরের বেশি সময়ে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। সড়কে প্রাণহানির এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে, রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে যাতায়াতব্যবস্থাকে সড়কনির্ভর করে তোলা, পরিবহন খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বুধবার (২১ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তা ও প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর পর্যবেক্ষণ করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, প্রকৃত হতাহত মানুষের সংখ্যা এই হিসাবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে দাবি সংগঠনটির।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ, আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। তুলনামূলক নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই মাধ্যমে তখন দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করতেন। সড়কপথ ব্যবহার করতেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ।

সংগঠনটির অভিযোগ, স্বাধীনতার পর বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে মানুষের যাতায়াত ক্রমেই সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়কে এককভাবে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে মনে করে সংগঠনটি।

প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণনির্ভর উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর অনিয়ম এবং অর্থের অপব্যবহার পরিবহন খাতের সংকট বাড়িয়েছে। রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো এবং সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে সড়কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, সড়ককেন্দ্রিক এই নীতি দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ জন্য অতীতের সরকারগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করে তারা।

সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে পরিবহন খাতের নানা অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে রয়েছে সড়ক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের একাংশের চাঁদাবাজি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল এবং লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া।

এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, যোগ্যতা যাচাই না করে লাইসেন্স দেওয়া, অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ প্রদান, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, বেপরোয়া গতি এবং মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর মতো বিষয়কেও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেছে সংগঠনটি। ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করা এবং বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোও ঝুঁকি বাড়ায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনটির অভিযোগ, সড়ক পরিবহন খাতে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশে চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য চলার কারণে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এবং চালক ও যানবাহনের যোগ্যতা যাচাইয়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বৃদ্ধি এবং অবাধ চলাচল সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। উন্নত গণপরিবহনের অভাব ও মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের ভোগান্তির সুযোগে এসব যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনটি বলেছে, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি নসিমন-করিমন, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা মাহিন্দ্রা ও পিয়াজিও এবং পিকআপভ্যানকে লেগুনায় রূপান্তর করে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এর সঙ্গে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

সড়কের অবকাঠামোগত ত্রুটিও দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, বাঁকে গাছপালার কারণে চালকের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া, মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি এবং যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহনও ঝুঁকি বাড়ায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে সড়কের ব্যবহার বাড়লেও সে অনুপাতে উন্নত গণপরিবহন, সমন্বিত বাসব্যবস্থা বা নির্দিষ্ট বাস নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিদিনের যাতায়াতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। এই সংকটের কারণে বিকল্প যানবাহনের ব্যবহার বাড়লেও সেগুলোর নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ সংগঠনটির।

সড়কে প্রাণহানি কমাতে পরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মতে, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) শুধু আমলানির্ভর ব্যবস্থাপনায় না রেখে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

সারা দেশে উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে চালকদের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যোগ্যতা যাচাইয়ের পর লাইসেন্স দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক পরিবহন খাতের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

সড়কের মান উন্নয়ন ও নিয়মিত মেরামত নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল থেকে সরিয়ে স্ক্র্যাপ করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো এবং চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আরও দাবি করেছে, একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন চলমান যুদ্ধে যত মানুষ নিহত হয়েছেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। তবে এ তুলনার পক্ষে পৃথক যুদ্ধভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

সংগঠনটির মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ বা সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। নিরাপদ নৌ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়ানো, উন্নত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যানবাহন ও চালকের মান নিশ্চিত করা এবং সড়কে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির এই প্রবণতা কমানো কঠিন হবে বলে মনে করে সংগঠনটি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে