মানুষের ৪টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য। বিশেষ করে মানব দেহের বৃদ্ধি, গঠন ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে খাদ্য অপরিহার্য। মানুষের সব মানবিক অধিকারের বাস্তব পূর্বশর্ত হলো তার দৈহিক অস্তিত্ব। আর দৈহিক অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত হলো খাদ্য। তাই খাদ্যের অধিকার শুধু একটি সামাজিক অধিকার নয়। এটি মানুষের জীবন, সুস্থতা, মর্যাদা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি এবং পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘খাদ্য’ বলতেই তা সুষম, স্বাস্থ্যকর ও গ্রহণের জন্য নিরাপদ হবে; মানুষ যা খাবে, সেটি তার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে না-এটাই হবার কথা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় ‘খাদ্য’ এবং ‘নিরাপদ খাদ্য’ দুটি আলাদা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য খাদ্যমূল্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। আবার সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্যই যদি অখাদ্যে রূপান্তরিত হয়, তা গ্রহণের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ খাদ্য যদি আমাদের জীবন-জীবিকার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা যে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হব তা কিন্তু যুদ্ধ ও মহামারির ভয়াবহতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাজেই এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য নিরাপদতা-দুটিই জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে বোঝায়, সব মানুষের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত, পুষ্টিকর ও গ্রহণযোগ্য খাদ্যের শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা। খাদ্য নিরাপদতা বলতে বোঝায়, খাদ্য যেন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হয় এবং প্রত্যাশিত ব্যবহার অনুযায়ী তা বিশুদ্ধ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত থাকে। পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও যদি তা ভেজাল, দূষিত বা পুষ্টিমানে ঘাটতিপূর্ণ হয়, তবে তা খাদ্য অধিকার পূরণ করে না। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে স্বাস্থ্যকর খাবারের জায়গা আশঙ্কাজনকভাবে দখল করে নিচ্ছে পুষ্টিগুণহীন, অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর খাবার। নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্যে সব মানুষের সমান প্রবেশগম্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনের চাপ বেড়েছে। এই চাপ সামাল দিতে কৃষি ব্যবস্থায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পুষ্টিগুণ ও গুণমান হারাচ্ছে খাদ্য। একই সঙ্গে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। এতে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ভোক্তারাও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিরাপদতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।