জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর ভাষায়, কে কী বলল বা কী ধরনের গুজব ছড়ানো হলো, তা বিবেচ্য নয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট হবে, এর এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অ্যালবার্ট গোম্বিস ও মর্স ট্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এই অবস্থান তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের বিষয়টি বুধবার (১৪ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
সাক্ষাৎকালে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসব বিভ্রান্তি সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকারে অটল। নির্বাচন শেষে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলেও তিনি জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “কে কী বলল, তা বিবেচ্য নয়। নির্ধারিত ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়।” তিনি আরও বলেন, ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে পক্ষপাতমুক্ত প্রশাসন পরিচালনা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যালবার্ট গোম্বিস এবং সাবেক অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ মর্স ট্যান নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে নির্বাচন ছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া খবর ও অপতথ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। জনগণের সম্মতি পেলে জুলাই সনদ গণতান্ত্রিক শাসনের এক নতুন যুগের সূচনা করবে এবং ভবিষ্যতে স্বৈরশাসনের কোনো সুযোগ থাকবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থকেরা নির্বাচনকে ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওসহ নানা ধরনের মিথ্যা প্রচারণা শনাক্ত করতে পারছে।
সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি গোম্বিস এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, ভুয়া খবর এখন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রুদের একটি হয়ে উঠেছে। এই হুমকি মোকাবিলায় আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বৈঠকে দুই মার্কিন কূটনীতিক গত দেড় বছরে সরকার পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার প্রশংসা করেন। তারা বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও তোলেন।
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার একজন বন্ধু হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তাঁর ভাষায়, “ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন তখনই সম্ভব, যখন কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে, অনুশোচনা প্রকাশ করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত তরুণদের নিয়েও অস্বীকারের অবস্থানেই রয়েছে।”
বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোর্শেদ উপস্থিত ছিলেন।