বাংলাদেশের অর্থনীতি টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ধারা পার করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা করোনা-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাময়িক প্রাক্কলনের তুলনায় প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে। অর্থনীতির এই ধারাবাহিক নিম্নগতি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়াল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তিন বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য বড় ধাক্কা। সর্বশেষ এত কম প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০১৯-২০ অর্থবছরে, যখন করোনা মহামারির প্রভাবে প্রবৃদ্ধি নেমে গিয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টানা দুই বছর হ্রাসের পর মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ ডলার। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই আয় বৃদ্ধির পেছনে মূলত মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব রয়েছে। কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধির গতি আগের বছরের তুলনায় শ্লথ হয়েছে। শিল্প খাতে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তা সামগ্রিক অর্থনীতিকে টেনে তুলতে যথেষ্ট হয়নি। বিবিএসের প্রতিবেদনে বিনিয়োগ কমার তথ্যও উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। একইসঙ্গে কমেছে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, শিল্প উৎপাদনও মন্থর হয়েছে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ১১ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, সুদের হার পুনর্বিবেচনা করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং নিয়মভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। গভর্নর বলেছেন, প্রবৃদ্ধি শুধু জিডিপি বাড়ানো নয়, বরং তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। শিল্প, এসএমই, কৃষি ও সেবা খাতে সমান সুযোগ তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেবে। ঋণ পুনঃতফসিল, সুদে ছাড়, বিশেষ তহবিল— এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। তিনি উচ্চ সুদের হারকে বিনিয়োগে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে সুদের হার কমানো হবে পরিস্থিতি বিবেচনায়, যাতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ না পড়ে। অর্থাৎ ঋণপ্রবাহ ও মূল্যস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য আনার কৌশল নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন গভর্নর। অনিয়ম, পক্ষপাত বা অস্বচ্ছতা রোধে কঠোর নজরদারি থাকবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে। সব সিদ্ধান্ত হবে তথ্য-উপাত্ত ও নীতিমালাভিত্তিক। এতে নীতি-অনিশ্চয়তা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং শিল্প উৎপাদনে মন্থর গতি। বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন ও সুদের হার পুনর্বিবেচনা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এ ভারসাম্য রক্ষা হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অপরদিকে, নিয়মভিত্তিক ব্যাংকিং ও সুশাসনের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ ও আস্থাহীনতার সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও চাপ বেড়েছে। কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা হতাশ হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প তৈরি হচ্ছে না, ফলে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে ধীর গতিতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, রফতানি বৃদ্ধি করতে হবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বস্তিদায়ক হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রবৃদ্ধি টানা তিন বছর ধরে কমছে, বিনিয়োগ ও সঞ্চয় কমছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নতুন গভর্নরের পরিকল্পনা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কঠোর নীতি, সুশাসন এবং কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যথায় প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।