রাজশাহীর সিল্কে বিদেশি সুতার দাপট, খাঁটির ক্রেতা কম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের অনন্য মেলবন্ধনে রাজশাহীর সিল্ক একসময় দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সূক্ষ্ম সুতা, নরম স্পর্শ আর দৃষ্টিনন্দন নকশায় তৈরি এই সিল্ক কাপড় সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু এখন রাজশাহীতে পাওয়া সব সিল্কের কাপড়ের সুতা এখানে তৈরি নয়। কাপড়ের জন্য সুতা আমদানী করা হয় চীন ও ভারত থেকে। কেবল রাষ্ট্রায়ত্ব রেশম কারখানায় তৈরি করা অল্প কিছু কাপড়ই শতভাগ খাঁটি। তবে এখানে ক্রেতা কম। বরং, ক্রেতারা ছোটেন সেই আমদানী করা সুতার কাপড় কিনতে। রেশম সংশ্লিষ্টরা জানান, রেশম গুটি থেকে পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে কাপড় তৈরি হয়। রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকায় প্রায় ২০টি ফ্যাক্টরি আছে। বেশিরভাগ কারখানা ভারত ও চীন থেকে সুতা আমদানি করে কাপড় প্রস্তুত করে। আর বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রাজশাহী রেশম কারখানায় রেশম গুটি থেকে সুতা তৈরি হয়। ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা সিল্কের কাপড়ের শোরুমগুলো রাজশাহীর সিল্ক নামেই ব্যবসা করে। বাস্তবে সুতা আনা হয় চীন ও ভারত থেকে। শুধু সরকারি কারখানাতেই রেশম গুটি থেকে কাপড় তৈরি হয়। বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, রেশম গুটির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে তুত গাছের মোট ১৬টি নার্সারি আছে। এরমধ্যে ১১টি সরকারি, পাঁচটি বেসরকারি। এসব নার্সারি থেকে পাওয়া রেশম গুটি থেকে বছরে ৪ টন ফাইন সুতা ও প্রায় ৪০ টন ওয়েস্টেজ সুতা পাওয়া যায়। আর সুতার চাহিদা প্রায় ৪০০ টন। তাই বাকি প্রায় ৩৫০ টন সুতা আমদানি করতে হয় চীন ও ভারত থেকে। এসব সুতা দিয়ে রাজশাহীতে কাপড় তৈরি হয়। সিল্কের পোশাকের দাম বেশি। তারপরও যে কোনো উৎসবের আগে রাজশাহীতে সিল্কের পোশাক কিনতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে যায়। এবার ঈদের আগেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ক্রেতাদের এই ভিড় দেখা যাচ্ছে শুধু ব্যক্তিমালিকানার শোরুমগুলোতে, যারা চীন ও ভারতের সুতা দিয়ে পোশাক তৈরি করেন। আর সরকারি রেশম কারখানার বিক্রয়কেন্দ্র চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। অথচ এখানেই শুধু পাওয়া যায় রাজশাহীর খাঁটি সিল্কের পোশাক। তবে ক্রেতারা বলছেন, সব ধরনের কাপড় না পাওয়ার কারণে এই বিক্রয়কেন্দ্রটি প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ব্যক্তিমালিকানার শোরুমগুলো আভিজাত্যে ভরা। সেই তুলনায় জীর্ণশীর্ণ এবং ছোট একটি বিক্রয়কেন্দ্র সরকারি কারখানার। ব্যক্তিমালিকানার শোরুমগুলোতে নানা ধরনের শাড়ি, পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি, থ্রি-পিস, শার্ট, হিজাব, ওড়না ও স্কার্ফসহ সব ধরনের পোশাক বিক্রি হচ্ছে সিল্কের নামে। আর সরকারি বিক্রয়কেন্দ্রে শুধু পাওয়া যায় শাড়ি, টুপি, শাল, হিজাব আর থান কাপড়। ফলে ক্রেতাদের উপস্থিতি এখানে খুবই কম। রাজশাহীতে সবচেয়ে বড় শোরুম সপুরা সিল্কের। বিসিকে সপুরার শোরুমে ঢ়ুকতে গেলেই কানে আসবে পাশেই কারখানায় সুতা থেকে কাপড় তৈরির লুম চালানোর শব্দ। সামনে কিছু রেশম গুটিও রোদে শুকাতে দেওয়া থাকে যাতে সেগুলো ক্রেতাদের নজরে আসে। কয়েকজন নারী ঢিমেতালে সেসব গুটি প্রক্রিয়াকরণের কাজে ব্যস্ত থাকেন। শনিবার সকালেও এ দৃশ্য চোখে পড়ল।
তবে সপুরা সিল্কের শোরুমের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান স্বীকার করেন, তাদের চাহিদা অনুযায়ী রেশম গুটি দেশে পাওয়া যায় না। তাই তারাও আমদানিকারকদের কাছ থেকে ভারত ও চীন থেকে আনা সুতা কিনে নেন। একইভাবে রাজশাহী সিল্ক ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক সেলিম রেজাও স্বীকার করেন, তাদের পোশাকও ভারত ও চীন থেকে আনা সুতায় তৈরি। সাইদুর রহমান জানান, এ বছর ঈদের আগে ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশ ভাল। ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে এমন অনেক জেলা থেকেও মানুষ রাজশাহীতে কেনাকাটা করতে আসছেন। ক্রেতাদের বড় অংশই সরকারি চাকরিজীবী কিংবা ব্যবসায়ী। রাজশাহীতে যারা চাকরি করেন, তারাও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ঈদের পোশাক কিনে বাড়ি পাঠাচ্ছেন। ব্যক্তিমালিকানার শোরুমগুলোতে বলাকা, মক্কা, কাতান ও চিপ কাতানসহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ি ১ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। পাঞ্জাবির দাম ১ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, শেরওয়ানির দাম ৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং থ্রি-পিসের দাম ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। সরকারি বিক্রয় কেন্দ্রে দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি। সপুরা সিল্কের শোরুমে শাড়ি কিনতে আসা ক্রেতা শবনম নাহার বলেন, তিনি সব সময়ই সিল্কের পোশাক পছন্দ করেন। এটি সবচেয়ে বড় শোরুম। তাই এখানেই আসেন। তবে এখানে যে ভারত ও চীন থেকে আনা সুতায় তৈরি পোশাক বিক্রি হয় তা তিনি জানেন না। নগরের শিরোইলে রাজশাহী রেশম কারখানার সঙ্গেই অবস্থিত সরকারি বিক্রয়কেন্দ্রে কথা হয় ক্রেতা তুহিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানে কালেকশন কম, দাম কিছুটা বেশি। তবে এখানে খাঁটি সিল্কের কাপড়ই পাওয়া যায়। ব্যক্তিমালিকানার শোরুমগুলোতে তো আমদানি করা সুতার কাপড়। এ জন্যই এখানে আসা। এখান থেকে কিনলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি এবং কালেকশন কম হওয়ার কারণে এখানে ক্রেতা কম।’জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান উৎপাদন ও বিপণন কর্মকর্তা আরিফা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের কালেকশন কম। কিন্তু যা থাকে সবই খাঁটি। যারা খাঁটি সিল্ক খোঁজেন, তারা এখানেই আসেন। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর ২০১৮ সালে কারখানার ১৯টি পাওয়ার লুম চালু হয়েছে। তারপর থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর জন্য আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করছি।’‘রাজশাহী সিল্ক’ বা রেশম ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এরপরও এখানে বিক্রি হওয়া সিল্কের পোশাকের সামান্যই ‘রাজশাহীর সিল্ক’। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রেশম চাষ সম্প্রসারণের বিকল্প দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘একসময় দেশে মাছ চাষের জন্য মধ্যমেয়াদে বিনাসুদে ঋণ দেওয়া হতো। তাতে মাছ চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়। রাজশাহী সিল্কের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে এখানেও চাষি ও ব্যবসায়ীদের বিনাসুদে মধ্যমমেয়াদী ঋণ দিতে হবে। তাহলে বিঘার পর বিঘা জমিতে তুত চাষ হবে।’তিনি মনে করেন, চাষি ও ব্যবসায়ীদের এমন সহযোগিতার পাশাপাশি এমন তুত গাছ উদ্ভাবন করতে হবে যাতে বছরের ছয় ঋতুতেই গাছে নতুন পাতা আসে। তাহলে আর সুতা আমদানি করা লাগবে না। বরং, চাহিদার ৪০০ টন সুতা উৎপাদন করে তা বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেশম সুতা উৎপাদনে অষ্টম। তখন বাংলাদেশ ভারত ও চীনের পরেই তৃতীয় অবস্থানে থাকবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। জানতে চাইলে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (সম্প্রসারণ) ড. এমএ মান্নান বলেন, ‘চাষিদের আসলেই ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। নতুন সরকার এসেছে। পাটমেলায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারাও রেশম শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী। সরকারের তরফে তারা আমাদের নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে বলেছেন।’ তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ব্যক্তিমালিকানার কারখানাগুলো সরকারি কারখানায় উৎপাদিত খাঁটি সুতা কিনতে আগ্রহী নয় বলেও তিনি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন খরচ যা পড়ে, তাতেই সুতা ও কাপড় বিক্রি করি। তারপরও তারা কিনতে আগ্রহী নয়। একাধিকবার টেন্ডার করেও আমরা সুতা বিক্রি করতে পারি না। কারণ, ট্যারিফ কম বলে চায়না সুতা ঢ়ুকে যাচ্ছে। কম দামে তারা সেসব সুতা কিনে পোশাক বানাচ্ছে।’