গজারিয়ায় মেঘনায় তেল চুরির সিন্ডিকেট, চলছে ডিজেল পাচার

এফএনএস (মোঃ আমিরুল ইসলাম নয়ন; গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ) : | প্রকাশ: ৩০ মার্চ, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
গজারিয়ায় মেঘনায় তেল চুরির সিন্ডিকেট, চলছে ডিজেল পাচার

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে এই চক্রটি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দিনের আলোতে জাহাজ থেকে তেল চুরির ঘটনার সত্যতা মিলেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি)'র লাইটার ভেসেল থেকে তেল চুরির এই প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রায় ১৮ বছর আগে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত জি.এম. বোরহান যিনি স্থানীয়ভাবে ‘গোপালী বোরহান’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে বিগত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মেঘনা পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় তিনি এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জনরোষে পড়ে তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় কয়েকজনকে ম্যানেজ করে আবারও সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার (২৮ মার্চ) উপজেলার ভাটিবলাকী এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এম.ভি. আকিজ-১৪ নামক একটি লাইটার জাহাজ থেকে অন্তত ২০টি গ্যালনে প্রায় ১ হাজার লিটার ডিজেল একটি ট্রলারে খালাস করা হচ্ছে। এর আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া অন্য একটি ভিডিওতে এম.ভি. আকিজ-বশির-৪ ভেসেল থেকেও একইভাবে তেল পাচারের দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায় স্থানীয় 'মাসুম' নামে এক ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই তারা এই কারবার চালাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা খোকন মিয়া বলেন, 'মেঘনার মোহনায় বিশেষ করে নদীর ভাটিবলাকী এলাকায় প্রায়ই দেখি শিপ থেকে তেল নামানো হচ্ছে। কখনো পাইপ দিয়ে আবার কখনো গ্যালনে করে জাহাজ থেকে হাজার হাজার লিটার তেল নামানো হয়। আগে রাতের আঁধারে এই অপকর্ম চললেও এখন তা দিনের আলোতেই ঘটছে।' ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, 'আগে গোপনে এই অপকর্ম চললেও এখন চোরাকারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, এর প্রধান কারণ তেলের বাজারে অস্থিরতা। বিভিন্ন জায়গা থেকে জ্বালানি তেল এনে তা নদীপথে পাচার করা হয়। মূলত যারা অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির সাথে জড়িত তারা প্রশাসনের চোখ এড়াতে নৌপথকে বেছে নিয়েছে।' বিষয়টি সম্পর্কে অভিযুক্ত জি.এম. বোরহানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, '২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাতে মেঘনা পুরাতন ফেরিঘাট এলাকা থেকে আমার ৫০ হাজার লিটার ডিজেল লুট হয় যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। এরপর থেকে আমি এই ব্যবসার সাথে জড়িত নেই। বর্তমানে আমি ঢাকায় থাকি দীর্ঘদিন গজারিয়া উপজেলায় যাইনি। কারো সাথে মিলে বা অন্য কারো মাধ্যমে আমি এই ব্যবসা পরিচালনা করছি না।' অভিযুক্ত ভাটিবলাকী গ্রামের মাসুম বলেন, 'ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি কেন আমার নাম বলল, তা আমার জানা নেই। আমার বৈধ ব্যবসা রয়েছে; আমি কোনো অপকর্মের সাথে জড়িত নই।' এদিকে তেল চুরি হওয়া প্রতিষ্ঠান আকিজ-বশির গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. কবির হাসান বলেন, 'এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে আমাদের একটি লাইটার ভেসেল থেকে তেল নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। বিষয়টি আমি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।' এ বিষয়ে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, 'বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। তৎক্ষণাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে অবগত করা হয়েছে। শীঘ্রই নৌ-পুলিশ, থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।'

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে