গ্রামীণ মেলা রঙ্গাতে মৃৎশিল্প

প্রকাশ ঘোষ বিধান
| আপডেট: ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম | প্রকাশ: ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম
গ্রামীণ মেলা রঙ্গাতে মৃৎশিল্প
প্রকাশ ঘোষ বিধান

বাংলার মেলা আর মৃৎশিল্প যেন একই বৃন্তের দুটি ফুল। মেলার সঙ্গে মৃৎশিল্পের এই গভীর সম্পর্ক। মৃৎশিল্প বাংলার হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মাটি ও কুমোরদের শৈল্পিক দক্ষতায় ফুটে ওঠে। পোড়ামাটির ফলক, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল ও শখের হাঁড়ি এই শিল্পের প্রধান নিদর্শন। মেলা মানেই যেখানে মাটির গন্ধে ম ম করা এক শৈল্পিক জগত। যা উৎসবের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

গ্রামীণ মেলায় মৃৎশিল্পের উজ্জ্বল উপস্থিতি। কুমোরদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির তৈজসপত্র লাল, নীল ও হলুদ রঙের আলপনায় সজ্জিত হয়ে মেলার পরিবেশকে রঙ্গিন ও প্রাণবন্ত করে তোলে। এই শিল্পে মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, সরা ও শখের হাঁড়ি মানুষের হাসি-কান্নার গল্প ফুটিয়ে তোলে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা, রথ মেলা কিংবা পৌষ মেলায় মাটির তৈরি জিনিসের পসরাই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। বাহারি রঙের শখের হাঁড়ি, মাটির পুতুল, ঘোড়া, হাতি এবং ছোটদের খেলনা ছাড়া মেলার পূর্ণতা আসে না।

চৈত্র সংক্রান্তি হলো বাংলা সনের শেষ দিন। পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতি হিসেবে উৎসব ও মেলার মাধ্যমে উদযাপিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব হলেও গ্রামীণ জনপদে তা অসাম্প্রদায়িক রূপ পায়। সংক্রান্তির প্রধান আকর্ষণ চড়ক পূজা, গাজন মেলা, ও নানা লোকজ আয়োজন। চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের ধারক।

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক মেলা, যেখানে মেলার সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির যোগাযোগ নিবিড়। বাংলার এই সংস্কৃতিতে থাকে সব ধর্মের মানুষের সংস্কৃতির সমন্বয়। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায় বা কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় মেলার। মেলাকে ঘিরে গ্রামীণ জীবনে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। গ্রামের মেলায় যাত্রা, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, জারি-সারি, রামায়ণ, গম্ভীরা কীর্তন, পালার আসর, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠি খেলা, হাডুডু খেলা মুগ্ধ করে আগত দর্শনার্থীদের। এখনও নাগরদোলা সব বয়সীদের কাছে প্রধান আকর্ষণ। মেলায় আবার বিভিন্ন নাটক বা যাত্রাপালারও আয়োজন করা হয়।

মৃৎশিল্প বা মাটির কাজ বাঙালির হাজার বছরের পুরনো এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা বংশপরম্পরায় কুমোররা বা পাল সম্প্রদায় টিকিয়ে রেখেছেন।  এই শিল্পের মূল উপাদান হলো এঁটেল মাটি, তবে দোআঁশ বা কাদামাটিও ব্যবহৃত হয়। চাকা ঘুরিয়ে বা হাতে ছাঁচ তৈরি করে মাটি দিয়ে পাত্র বা মূর্তি বানানো হয়। এরপর সেগুলোকে কড়া রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে (পন) উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয় যাতে সেগুলো টেকসই ও  মজবুত হয়। মাটির তৈরি এই সামগ্রীগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়।

মৃৎশিল্প মাটি আর রঙের খেলা, মেলা রঙ্গাতে মৃৎশিল্প। এই কথাটি সার্থক হয় যখন কুমোরদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির তৈজসপত্রে উজ্জ্বল লাল, নীল, হলুদ ও সাদা রঙের আলপনা ফুটে ওঠে। মাটির সামগ্রীতে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুখের অনুভূতি, প্রেম-বিরহের নানা দৃশ্যপট, মনোমুগ্ধকর ছবি হাতের স্পর্শে ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। বিশেষ করে মাটির সরা এবং হাঁড়িতে আঁকা লোকজ মোটিফগুলো মেলাকে এক অনন্য রূপ দেয়।

অনেক মৃৎশিল্পী সারা বছর মেলা বা পার্বণের অপেক্ষায় থাকেন। বর্তমানে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে এই শিল্প সংকটে পড়লেও মেলাগুলোতে এখনও মাটির নান্দনিক পণ্যের ভালো চাহিদা থাকে, যা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। এই পরিবেশবান্ধব শিল্প প্লাস্টিক দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তবে আধুনিক উপকরণের দাপটে এটি বর্তমানে সংকটের পথ থেকে বেরুতে পারেনি।

গ্রামীণ মেলা আর মৃৎশিল্প যেন একই সুতায় গাঁথা। মেলা মানেই মাটির তৈজসপত্র আর খেলনার এক রঙিন দুনিয়া। গ্রামবাংলার চৈত্র সংক্রান্তি, বৈশাখী, বারুণী মেলা বা যে কোনো মেলা হোক, মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের কাজ ছাড়া মেলার পূর্ণতা আসে না। মাটির শিল্প আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির বাহক। ময়নামতির শালবন বিহার বা বগুড়ার মহাস্থানগড়ে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা আমাদের সেই প্রাচীন গৌরবের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা আজও মেলার মাধ্যমে বেঁচে আছে।

বর্তমানে প্লাস্টিক ও টিন-লোহার ব্যবহারের ফলে মৃৎশিল্পের চাহিদা কমছে। অনেক কারিগরকে আর্থিক সংকটের মুখে ফেলছে। শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় কুমোররা এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। মেলা মানেই তাদের তৈরি পসরা বিক্রির প্রধান সুযোগ।প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের সহজলভ্যতার কারণে এই শিল্পটি অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও বাংলার মেলাগুলো এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে এখনও তার স্বমহিমায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।

বর্তমান সময়ে আধুনিক সরঞ্জামের ভিড়ে মাটির জিনিসের চাহিদা কমলেও শৌখিন জিনিস হিসেবে মৃৎশিল্পের কদর রয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখে মাটির সানকিতে পান্তা খাওয়া বা ঘর সাজাতে মাটির ফুলদানি ব্যবহারের রীতি একে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। পরিবেশ সচেতনতা বাড়ায় আধুনিক সময়ে ঘরের অন্দরসজ্জায় মাটির জিনিসের পুনরুত্থান ঘটছে।  বাংলাদেশ থেকে বিদেশে মাটির পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট