ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে তিনর্ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত প্রাচীন ‘শহর মোহাম্মদাবাদ’। মোহাম্মদাবাদের বর্তমান নাম বারোবাজার।ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে আর যশোর জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক মসজিদ পরিবেষ্টিত এই শহর। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় পঞ্চদশ শতাব্দীতে হজরত খানজাহান আলী (রহঃ) বারোজন সহচর নিয়ে এ এলাকায় আসার পর থেকে এর নাম হয় বারোবাজার। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে এখানকার মাটি খুঁড়ে সন্ধান মিলে ১৯টি মসজিদের নিদর্শন। প্রতিদিন শত শত লোক এই শহরে ভিড় করে পঞ্চদশ শতাব্দীর নিদর্শন মসজিদ দেখতে। পঞ্চদশ শতাব্দির রাজধানীখ্যাত শাহ মোহাম্মদাবাদে সুলতানী সাশনামলের ঐতিহাসিক স্থান বারোবাজারে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক ১৯ মসজিদ, স্থাপনা ও নিদর্শন। এ সবই সুলতানি আমলের স্থাপত্য শিল্পের অনন্য নিদর্শন।বারোজন আউলিয়ার নামানুসারে বারোবাজারের নামকরণ করা হয়। আউলিয়ারা হলেন এনায়েত খাঁ, আবদাল খাঁ, দৌলত খাঁ, রহমত খাঁ, শমসের খাঁ, মুরাদ খাঁ, হৈবত খাঁ, নিয়ামত খাঁ, সৈয়দ খাঁ, বেলায়েত খাঁ ও শাহাদাত খাঁ।১৯৯৩ সালে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব্ব বিভাগ এখানে প্রত্ননিদর্শন গুলো উদ্ধারের জন্য খনন কার্য পরিচালনা শুরু করে। সেই সময় বেশ কিছু মসজিদ,সেনা ছাউনি,সিড়ি,কবরস্থান, নদী বন্দর বা জাহাজ ঘাট আবিস্কৃত হয়।আউলিয়াদের পূন্যভূমি বারোবাজারে আরও রয়েছে ইতিহাস প্রসিদ্ধ গাজি-কালু-চম্পাবতীর মাজার। রয়েছে সুলতানী শাসন আমলের ১৯ টি মসজিদ। যা এতদিন মাটির নীচে ঢাকা ছিল ও দিঘি রয়েছে ২০ টি।ইতিহাস থেকে জানা যায় এখানে ১২৬ টি দিঘি ছিল কিন্তু কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে গেছে। অনেক স্থান দখল হয়ে গেছে। প্রায় ১১ বর্গ মাইল এলাকাজুড়ে রয়েছে বহু অজানা প্রত্ন সম্পদ।বাংলাদেশের গৌরবময় এক ঐতিহাসিক স্থান। প্রাচীনকাল হতেই বারোবাজার গুরুত্বপূণ প্রত্নস্থর্ল হিসাবে বিবেচিত। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম সভ্যতার সম্মিলিত চারণভূমি এই জায়গাটি বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর মর্যাদা পেয়ে এসেছে। এমনকি গ্রীক ইতিহাস অনুযায়ী বারোবাজার গঙ্গারিডিদের রাজধানী ছিল বলেও জানা যায় বহু কীর্তি চিহ্ন মন্ডিত, বহু প্রাচীন, বহু বিস্তৃত এবং অধুনা অবহেলিত এমন স্থান এই প্রদেশে আর নেই।এই জায়গাটির অনেক দক্ষিণে মড়লীতে প্রাচীন জনপদ সমতটের রাজধানী ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১২০৪ খ্রিঃ পর্যন্ত এই অঞ্চল সেনরাজাদের এবং ১৩৮০ খ্রিঃ পর্যন্ত পাল রাজাদের তত্বাবধানে ছিল রাজা শশাঙ্কের শাসনের পর সপ্তম শতকের মধ্যভাগে এই অঞ্চল বৌদ্ধদের দ্বারা শাসিত হয়।
বিখ্যাত বণিক চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য কেন্দ্র বারোবাজার ছিল বলে জানা যায়। বারোবাজার রেলস্টেশনের প্রায় ৪ কি.মি. পরিধির মধ্যে দৌলতপুর, সাদীপুর, মিঠাপুকুর, হাসিলবাগ বেলাত,বাজেদিহি,ফুলবাড়ি,গৌরিনাথপুর,রহমতপুর প্রভৃতি নামের গ্রাম গুলোতে বিক্ষিপ্ত ভাবে একটি মধ্যযুগীয় শহরের অস্তিত্ব দেখা যায় এর ঠিক উত্তরেই পুরাতন বৈরব নদীর একটি খাত প্রবাহিত।
সাতগাছিয়া মসজিদ ঃ
বারবাজারে সাতগাছিয়া মৌজায় আদিনা মসজিদ অবস্থিত। বড় একটি পুকুরের দক্ষিণ পাশে এই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। এটির শুধু দেয়াল আর নিচের অংশই অবশিষ্ট আছে। সর্বপ্রথম গ্রামের লোকজনই মাটিচাপা পড়ে থাকা এই মসজিদ উদ্ধার করে। এ এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। প্রায় ৭৭ ফুট লম্বা ও ৫৫ ফুট চওড়া মসজিদের ভেতরে আছে ৪৮টি পিলার। এটি ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। পশ্চিম দেয়ালে লতা-পাতার নকশা সমৃদ্ধ তিনটি মিহরাব আছে। এটি ১৯৯২ সালের দিনে আংশিক সংস্কার করা হয়।
গলা কাটা মসজিদ ঃ
বারবাজার মৌজায় গলা কাটা মসজিদ অবস্থিত। ২১ পুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া এই মসজিদ খনন করা হয় ১৯৯৪ সালে। ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। এর দেয়াল গুলো প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। মাঝখানে আছে লম্বা দুটি কালো পাথর। জনশ্রুতি আছে বারোবাজারে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। প্রজাদের বলি দিয়ে মসজিদের সামনের দিঘির মধ্যে ফেলে দিত সে। এ কারণেই এর নাম হয় গলাকাটা।
নুনগোলা মসজিদ ঃ
বারোবাজারের হাসিলবাগ গ্রামে বড় দিঘির পশ্চিম পাশে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট নুনগোলা মসজিদ। বর্গাকৃতির এ মসজিদে তিনটি অর্ধবৃত্তকার মেহরাব আছে। মেহরাবে ছোট ছোট বর্গাকৃতির মধ্যে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা আছে। মসজিদের বাইরের দেওয়ালে পর্যায় ক্রমিক খাড়া চাল ও খাঁজ আছে। এগুলোয় দিগন্ত রেখাকৃতির ছাচে গড়া নকশা আছে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এটি। স্থানীয়রা একে লবণগোলা মসজিদ বলে থাকেন। তবে এ নামকরণের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
হাসিলবাগ মসজিদ ঃ
নুনগোলা মসজিদের সামান্য পশ্চিমে এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এটি। হাসিলবাগ মসজিদ নামে পরিচিত এ মসজিদের আরেক নাম শুকুর মল্লিক মসজিদ। পোড়া মাটির তৈরি মসজিদটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। হাসিলবাগ এলাকায় দমদম জাহাজঘাটা ও সেনানিবাস ও নদীবন্দর ছিল। মসজিদটির উভয় পাশে একটি করে বন্ধ মেহরাবসহ পশ্চিম পাশে একটি অর্ধবৃত্তাকৃতির মেহরাব আছে। এ মেহরাব গুলো সজ্জিত করা হয়েছে পোড়ামাটির ঘণ্টা ও চেইন নকশায়। অপরূপ নকশা গুলো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
পাঠাগার মসজিদ ঃ
ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে এক গম্বুজ বিশিষ্ট পাঠাগার মসজিদ। লাল ইটের তৈরি এই মসজিদ আকারে ছোট। দীর্ঘদিন মাটি চাপা পড়ে থাকার পর ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ব অধিদফতর মসজিদটি সংস্কার করে। জনশশ্রুতি আছে সুলতানী আমলে নির্মিত এ মসজিদ কেন্দ্রিক একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। মসজিদের পাশেই বড় আকারের একটি দিঘি, নাম পিঠেগড়া পুকুর। বেলাট দৌলতপুর এলাকায় পাঠাগার মসজিদ আবিষ্কৃত হয়।
পীর পুকুর মসজিদ ঃ
পাঠাগার মসজিদের পশ্চিম দিকের সড়কে দুটি বাঁক ঘুরলেই বিশাল দিঘি, নাম পীর পুকুর। এ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আছে বড় আকৃতির একটি মসজিদ। ১৯৯৪ সালে খনন করে মাটির নিচ থেকে বের করা হয়েছে স্থাপনাটিকে। এ মসজিদে ছাদ নেই, শুধু দেয়াল আছে। মসজিদটি লাল ইটের তৈরি। বেলাট দৌলতপুর মৌজায় ১৬ গম্বুজ বিশিষ্ট পীর পুকুর মসজিদ অবস্থিত।
গোড়ার মসজিদ ঃ
পীরপুকুর মসজিদের পাশের তাহেরপুর সড়ক ধরে সামান্য পশ্চিম দিকে হাতের বায়ে আরেকটি প্রাচীন মসজিদের দেখা মিলবে। এর নাম গোড়ার মসজিদ। এ মসজিদটি চার গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদের মিহরাব ও দেয়ালে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা ফলের নকশাসহ নানান কারুকার্যমন্ডিত।বাইরের দেয়ালও লাল ইটে মোড়ানো।বেলাট দৌলথপুর মৌজায় ৪ গম্বুজ বিশিষ্ট গোড়ার মসজিদ অবস্থিত। মসজিদটি খান জাহান আলী কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে প্রবল জনশ্রুতি আছে। ১৯৮৩ সালে এ মসজিদের সন্ধান পায় প্রত্নতত্ব অধিদফতর। মসজিদটি খননের সময় একটি কবরের সন্ধান মেলে। আরও শোনা যায়, পাশের কবরটি গোড়াই নামের কোনো এক দরবেশের। এ থেকেই এর নাম গোড়াই বা গোড়ার মসজিদ।
জোড় বাংলা মসজিদ ঃ
বারবাজার মৌজায় জোড় বাংলা মসিজদ অবস্থিত। মসজিদটি পুনঃসংস্কার করা হয় ১৯৯৩ সালে। খননের সময় এখানে একটি ইট পাওয়া যায়, তাতে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল, ‘শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইন, ৮০০ হিজরি। এ থেকে ধারণা করা হয় ৮০০ হিজরির দিকে সুলতান মাহমুদ এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৯২-১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব বিভাগ খনন করে এটি উন্মোচিত করে। ছোট ছোট পাতলা ইটে গাঁথা এই মসজিদ ১১ ফুট উঁচু একটি প্লাটফর্মের ওপর স্থাপিত। জনশ্রুতি আছে মসজিদের পাশে জোড়া কুড়েঘর ছিল বলেই এর নাম জোড় বাংলা মসজিদ।
মনোহর মসজিদ ঃ
১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদফতর বারোবাজার প্রস্তগুলো খননকার্য পরিচালনা করে। সে সময় মনোহর ঢিবি নামক স্থান থেকে এই প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। এ মসজিদটি যেখানে আবিষ্কৃত হয় তার পাশে একটি জলাশয় থাকায় একে মনোহর দিঘির মসজিদ নামে ডাকা হয়। মনোহর মসজিদটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে লম্বাভাবে নির্মিত। অভ্যন্তরের আয়তন ২২.৬৭ ও ২২.৬৭ ফুট এবং মসজিদের দেয়াল গুলোর পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট। মসজিদের মিনারগুলো নির্মাণে ইট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি সারিতে ৪টি করে স্তম্ভ মিলিয়ে মোট স্তম্ভরের পরিমাণ ২৪টি। ধ্বংসাবশেষ দেখে ধারণা করা হয়, মসজিদের মাথায় গম্বুজ ছিল ৩৫টি এবং ৪টি মিনার ছিল। খননের ফলে দুটি মিনারের ৫ ফুট পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
এখানে রয়েছে ১২৬টি দীঘি ও পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি উল্লেখযোগ্য দিঘির নাম ও পরিধির কথা জানা যায়। পীরপুকুর : ৪ একর,গোড়ার পুকুর : ৫ একর,সওদাগর দিঘি : ১১ একর,সানাইদার পুকুর : ৩ একর,সাত পীরের পুকুর : ৩ একর,ভাইবোনের দিঘী : ৪ একর,
আনন্দ দিঘী : ২ একর, গলাকাটা দিঘী : ৪ একর,জোড়াবাংলা দিঘী : ৩ একর,চোরাগদা দিঘী : ৪ একর,মাতারানী দিঘী : ৮ একর,নুনগোলা দিঘী : ৩ একর,কানাই দিঘী : ৩ একর,পাঁচ পীরের দিঘী : ৩ একর,মনোহর দিঘী : ৩ একর,আদিনা দিঘী : ৩ একর,শ্রীরাম রাজার দিঘী : ১০ একর এবংবেড় দিঘী : আট একর।