অনুসন্ধানী রিপোর্ট

অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে ব্রহ্মপুত্র-নীলসাগর নৌ-যান

এফএনএস (শাহ জামাল; মেলান্দহ, জামালপুর) :
| আপডেট: ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম | প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে ব্রহ্মপুত্র-নীলসাগর নৌ-যান

অযত্ব অবহেলায় নদীতে ভাসমান কিংবা নিমজ্জিত অবস্থায় পড়ে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ উদ্ধারকারী নৌ-যান (রেসকিউ বোট)। বন্যা দুর্গত এলাকায়-নৌ-ডাকাতি, ঘুর্ণিঝড়সহ নদী পথের যেকোন দুর্যোগ মোকাবেলায় এই নৌযানগুলো ব্যবহার হতো। এসব নৌ-যানের চমৎকার নামকরণও হয়েছে জেলার আঞ্চলিক নদী বা হাওড়ের নামানুসারে। এর মধ্যে শুধু জামালপুর জেলার জন্য বরাদ্দকৃত ব্রহ্মপুত্র নামে ৪টি, নীলফামারী জেলার নদীর নামানুসারে নীল সাগর নামীয় ২টি নৌ-যানসহ অন্যান্য আরো অর্ধশতাধিক নৌ-যানগুলোও অবহেলা অযন্তে অলস পড়ে আছে। অনুসন্ধানী রিপোর্টে বেরিয়ে আসে প্রকৃত চিত্র।

বন্যা-নৌ-ডাকাতি বা প্রাকৃতিক যেকোন দুর্যোগের সময় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় দ্রুতগতির এই বোটগুলো ব্যবহার করা হয়। দুর্যোগের সময় বিশেষ করে নারী-শিশু-বৃদ্ধ, রোগাগ্রস্থ মানুষ ও গবাদি পশুকে রক্ষায় নৌ-যান একান্ত প্রয়োজন।

২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় মাল্টি পারপাস এক্সেসেবল রেসিকিউ বোট (বহুমূখী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের লক্ষ্যে নৌ-যান সংগ্রহ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মোট ৬৮টি নৌ-যান (রেসকিউ বোট) বরাদ্দ দেয়। তারও আগে ২০২১ সালের দিকে সারাদেশে বেশ ক’টি নৌ-যান বা রিসকিউ বোট সরবরাহ করা হয়েছে। রিসকিউ বোটের রক্ষণা বেক্ষণ বা মেরামত খাতের অর্থ লোপাট এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের অজুহাতে এই সচল যানগুলো অচল দেখিয়ে মেরামত এবং লোকবল নিয়োগের নামেও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা শুরু হয়েছে। আগে থেকেই অচল এবং সচল নৌ-যান সনাক্তের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন-৭১’র গেরিলা, লালমনিরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক ও লালমনিবার্তার সম্পাদক এস.এম. শফিকুল ইসলাম কানু। এতে সরকারি সম্পদ ও অর্থ দু’টোই রক্ষা হবে।

তুলনামূলক বন্যা ও দুর্যোগ কবলিত নদী-হাওড় বেষ্টিত অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জামালপুর, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মাদারিপুর, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ি, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা জেলায় প্রকল্পটি চালু করা হয়।

এরমধ্যে শুধু জামালপুর জেলা সদরে ব্রহ্মপুত্র-১, ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র-২, সরিষাবাড়িতে ব্রহ্মপুত্র-৩,  এবং দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র-৪, নামে মোট ৪টি নৌযান বরাদ্দ দেয়া হয়। বহুমূখী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের লক্ষ্যে নৌ-যান সংগ্রহ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মালামালসহ প্রতিটি নৌ-যানে দুইজন করে দক্ষ গ্রিজার (ড্রাইভার) ও লস্কর (সহকারি ড্রাইভার) পদে মোট ৮ জনকে নিয়োগ দেয়। অন্যান্য জেলায়ও প্রতিটি নৌ-যানের জন্য ২জন করে কর্মচারি নিয়োগ দেয়া হয়।

এক বছর চলার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ’লীগ সরকারের পট পরিবর্তনের সময় নৌ-যানগুলোর মুল্যবান মালামালও চুরি হয়। ইতোমধ্যেই কর্মচারিদের বেতন-ভাতাদিও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অযত্ন-অবহেলায় নৌ-যানগুলো অলস অবস্থায় পড়ে আছে। কোনটি আছে পানিতে, কোনটি মাটিতে আছে। এসব সরকারি সম্পদ রক্ষায় নেই কোন উদ্যোগ।

জামালপুরের বিশিষ্ট নাগরিক সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম জানান-অযত্নে পড়ে থাকা নৌ-যানের দুরবস্থা-সংস্কার পূর্বক সচল করতে ডিসির বরাবর আবেদনসহ সোশ্যাল মিডিয়া তুলে ধরেছি। দ্রুত মরামত না করায় এ গুলো ব্যবহার হচ্ছে না। আর্থিক অনটন থাকলেও, নৌ-যানগুলো হাওড় বা বন্যাকবলিত শিশু-কিশোরদের বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষার কাজেও ব্যবহার উপযোগি করা যেতে পারে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুরের ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং গাইবান্ধা-বালাসীঘাট, সাঘাটার সীমান্তবর্তী এলাকায় যমুনা নদীর মোরাদাবাদ ঘাটে অযত্ন-অবহেলায় ব্রহ্মপুত্র-২ ও ব্রহ্মপুত্র-৪ নামে দু’টি নৌ-যান অলস অবস্থায় পড়ে আছে। এর দেখভালের দায়িত্বে থাকা জামালপুর জেলা প্রশাসকের নির্দেশিকা সম্বলিত একটি নোটিশ সাটানো আছে। 

জামালপুর যমুনা নদীর তীরের অধিবাসি ও মোরাদাবাদ ঘাটের শ্রমিক দিলু মন্ডল (৫০) জানান-আমার বাড়ির ঘাটেই দু’টি সরকারি বোট পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আমি ও আমার স্ত্রী স্বেচ্ছায় প্রতিদিনই বোটের পানি অপসারণ করতেছি। পানি অপসারণ না করলে নদীতে তলিয়ে যাবে। ৫ আগস্টের পর দুস্কৃতিকারিরা এর কিছু মালামাল চুরি করেছে। এলাকাবাসির সহায়তায় আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুস্কৃতিকারীদের মোকাবেলা করেছি। স্বামী-স্ত্রী পালাক্রমে রাত জেগে পাহারাও দিচ্ছি। বর্তমানে নৌ-যান দু’টি আটকানোর জন্য লোহার রশিও নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাজার থেকে মোটা রশি কিনে নৌ-যান দু’টি ঘাটে বেঁধে রেখেছি। নদীর পানি বাড়লে কি হবে, বলা যায় না। নৌ-যান দু’টি সরকারের হেফাজতে নেয়া উচিৎ।

সরিষাবাড়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মি. শওকত জামিল জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নামে নৌ-যানটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণে নিলেও, তা অলস পড়ে আছে। এর কিছু মুল্যবান মালামাল যেমন, ব্যাটারি, ইঞ্জিন বা বোটের বিভিন্ন টুলস চুরি হয়েছে। বাকি ৩টির কথা আমি জানি না। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র-১ নৌ-যানটি জামালপুর শহরে ব্রহ্মপুত্র মরা নদের পাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকায় মুল্যবান মালামাল চুরি হয়েছে।  জামালপুর জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ডিআরআরও সাহেবের সাথে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন।

এ ব্যাপারে জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুণর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) আব্দুল্লাহ আল কাফি জানিয়েছেন, জেলার জন্য বরাদ্দকৃত চারটি সচল নৌযানই অলস পড়ে আছে। তিনি নৌ-যানের মালামালও খোয়া যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এসব সরকারি সম্পদ চুরিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, এগুলো পরিচালনার জন্য কোন বরাদ্দ দেয়া নাই। বরাদ্দের জন্য প্রতিনিয়তই অধিদপ্তরের কাছে লেখা লেখি করা হচ্ছে।  দেশের অন্যান্য জেলার নৌ-যানগুলো একই অবস্থায় থাকার কথা জানা গেছে। সিরাজগঞ্জ জেলার নৌ-যানের সর্বশেষ অবস্থা জানতে জেলা প্রশাসক মো: আমিনুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনিও ডিআরআরও অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন।

সিরাজগঞ্জ দুর্যোগ (আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণ সংস্কার ও উন্নয়ন) উপসহকারি প্রকৌশলী মো: মোস্তফা মিয়া। তিনি জানান-৫ আগস্টের পর আমাদের ৩টি রিসকিউ বোট প্রশাসনের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। বোটের চুরি হওয়া মালামাল ফিরে পাবার সম্ভাবনা নাই। সুনামগঞ্জ জেলার ডিআরআরও হাসিবুর রহমান জানান-দেড় বছর আগে কর্মচারিদের বেতন-ভাতাদি বন্ধ হয়েছে। ৫ আগস্টের পর ৪টি নৌ-যানের ইঞ্জিনসহ অনেক মালামাল চুরি হয়েছে। বর্তমানে এগুলো অচল। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাবরে লেখা হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার ডিআরআরও আব্দুল মতিন জানান-প্রকল্পটি বন্ধ আছে। সরকারি সম্পদ রক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কর্মচারিদের বেতন নাই। এগুলো কিভাবে চলবে? ৪টি নৌ-যান স্থানীয়ভাবে কিছুদিন চালিয়েছি। 

নীলফামারী জেলার নীল সাগর বোটগুলোও অবহেলায় পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার স্থানীয় সংবাদকর্মী কামরুজ্জামান মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি সম্পদ রক্ষায় আমি নিজেও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কাছে ধর্না দিয়েছি। গত বছর এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট করেও; কর্তৃপক্ষের সাড়া মেলেনি। নৌ-যান রক্ষায় রং লাগানো, পাটাতনের মতো কিছু ক্ষুদ্র মেরামত খাতের প্রায় ২ লাখ টাকার কোন কাজ হয়নি। অথচ টাকারও হদিস নেই। লালমনিরহাট জেলার ডিআরআরও মীর ফসাল আলী জানান-রিসকিউ বোটের বর্তমান অবস্থা আমার জানা নেই। পরে ফোন দিয়েন। খোঁজ নিয়ে জানাবো।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে