রাজস্ব আদায়ে বড় ধস, ৯ মাসেই ঘাটতি ছাড়াল ৯৮ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
রাজস্ব আদায়ে বড় ধস, ৯ মাসেই ঘাটতি ছাড়াল ৯৮ হাজার কোটি টাকা

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গভীর উদ্বেগের সংকেত।

এই সময়ে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক তিনটি প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। তবে একই সঙ্গে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে এনবিআর জানিয়েছে। তবুও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা, কর আদায়ে ফাঁকফোকর এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এই ঘাটতির প্রধান কারণ। এনবিআর অবশ্য বলছে, উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্থনীতির মন্থর প্রবৃদ্ধির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই নয় মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায়, যা গত অর্থবছরের পুরো সময়ের ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং শুল্ক খাতে ঘাটতি ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা।

বিশেষ করে মার্চ মাসে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। এক মাসে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় এটি অনেক কম গতির প্রবৃদ্ধি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই চাপ থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। করদাতার দেওয়া কর পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে, না হলে ঘাটতি বাড়তেই থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর আদায় ব্যবস্থা, নতুন কর ক্ষেত্র শনাক্ত এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর নীতি গ্রহণ করা জরুরি।

অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা, বিনিয়োগে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, “অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।”

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ঘাটতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরেও সরকারকে বাড়তি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে