জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৫ দশমিক ০১ শতাংশ।
বাসস জানায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, “২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।”
বিপিডিবি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ১৩টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৫৭২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন রুফটপ সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে ১ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৬টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি সরকারি উদ্যোগে এবং ২০টি বেসরকারি খাতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আরও ১৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বিপিডিবির তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ও অফ গ্রিড নবায়নযোগ্য শক্তি যুক্ত করলে এই সক্ষমতা দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াটে। তবে বাস্তব উৎপাদন এর চেয়ে অনেক কম। গত শনিবার দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৭৫৫ মেগাওয়াট। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার থেকে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের মধ্যে ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত রয়েছে। বাকি ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট অফ গ্রিড ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়ু বিদ্যুৎ থেকে ৬২ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে শূন্য দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট এবং বায়োমাস থেকে শূন্য দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃহৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তিনি বলেন, “এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, “বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক জ্বালানি মহাপরিকল্পনা জরুরি।”
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) এর প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, “১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে প্রায় ২ দশমিক ৯৪ থেকে ৩ কোটি টাকা আমদানি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা আইরেনার তথ্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চীন। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশও ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।