টানা ভারী বর্ষণ ও দমকা ঝড়ে মৌলভীবাজারের রাজনগরে জনজীবন ও কৃষি খাতে নেমে এসেছে ব্যাপক বিপর্যয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ধারাবাহিকতায় একদিকে যেমন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে হাওরাঞ্চলের পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে কৃষকের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকাল থেকে বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত প্রায় ৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে কাওয়াদিঘী হাওরে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার প্রায় ২৩০ হেক্টর পাকা ধান সম্পূর্ণ রোপে এবং ৩১৫ হে আংশিক ভাবে তলিয়ে গেছে। মাঠভর্তি সোনালি ধান কাটা শেষ হওয়ার আগেই পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে প্রায় ৬৪ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় মাত্র ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারনে ধান কাটতে বিলম্ব হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ ফসল এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এদিকে ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে কাউয়াদিঘী হাওরে গিয়ে দেখা গেছে চোখের সামনে মাট ভরা সোনালী ধান পানিতে ডুবে যাওয়া কৃষকের বুক পাটা কান্নার আহাজারি। বেতাগুঞ্জা গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে যারা কাজ করছেন, তাদের অর্ধেক সময় কাজ করলেও পূর্ণ দিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, একজন শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকা ব্যয় হলেও বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।কৃষক সাইফুল মিয়া, জয়নাল মিয়া বলেন, কষ্ট করে ধান কেটে আনার পরও রোদের অভাবে তা শুকানো যাচ্ছে না। ভেজা ধান স্তূপ করে রাখায় তাতে চারা গজিয়ে যাচ্ছে, ফলে তা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ডুবে থাকা পাকা ধান কৃষককে দ্রুত কেটে কেটে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নন হাওরের উঁচু জমির ধান কাটার জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে কাশেমপুর পাম্প হাউসের ৭টি পাম্প চালু রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিক সংকট নিরসনে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৩৫ জনের বিশেষ টিম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি সচল রাখতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।