ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)Ñরাজধানীর শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন প্রশ্নে তাদের নানা উদ্যোগ সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে “পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ” নীতি, সঠিক তালিকা প্রণয়নের অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনাÑএসব কারণে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং আরও জটিল হয়েছে। হকার পুনর্বাসনের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভিত্তিমূল বিষয় হলো সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন। একটি বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং ন্যায়ভিত্তিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কারা প্রকৃত হকার, তাদের সংখ্যা কত, তারা কোথায় এবং কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই মৌলিক তথ্য ছাড়া যেকোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো হয়ে যায়। সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রায়ই দাবি করে যে তারা হকারদের তালিকা করেছে, কিন্তু বাস্তবে সেই তালিকা হয় অসম্পূর্ণ, নয়তো বিতর্কিত। সঠিক তালিকা না থাকলে প্রকৃত হকাররা বঞ্চিত হয় এবং অপ্রকৃত ব্যক্তিরা সুবিধা ভোগ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে ভুয়া নাম তালিকাভুক্ত হয়। এতে করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যখন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তখন প্রকৃত হকাররা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুনর্বাসনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। এই ভুল উদ্যোগ শুধু অন্যায়ই নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি সঠিক তালিকা সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কতজন হকারকে পুনর্বাসন করতে হবে, কোথায় তাদের বসার ব্যবস্থা করা হবে, কী ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন এসব সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নিতে হলে নির্ভুল তথ্যের বিকল্প নেই। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় নানা সমস্যার সৃষ্টি করে এবং প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। পুনর্বাসন পরিকল্পনার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রায়ই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে, কিন্তু বিকল্প জীবিকার কোনো টেকসই ব্যবস্থা করে না। ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তারা কোথায় বসবে, কীভাবে ব্যবসা চালাবে এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর থাকে না। ফলে হকাররা বাধ্য হয়ে আবারও রাস্তায় ফিরে আসে। এতে করে প্রশাসন ও হকারদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। সমন্বয়হীনতা একটি গুরুতর ব্যর্থতা। সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। একদিকে সিটি কর্পোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালায়, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে হকারদের বসতে দেওয়া হয় বা অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। এই দ্বৈত নীতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব লক্ষণীয়। হকাররা সমাজের নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের জীবিকা নির্ভর করে দৈনিক আয়ের ওপর। হঠাৎ করে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে তাদের জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া মানে তাদের পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উচ্ছেদের সময় তাদের মালামাল নষ্ট করা হয় বা জব্দ করা হয়, যা সম্পূর্ণ অমানবিক। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে এই ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়েÑযেমন বিশেষ দিবস বা গুরুত্বপূর্ণ ভিজিটের আগে রাস্তা পরিষ্কার করা। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান দেখা যায় না। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার বিবেচনায় নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না করাও একটি সমস্যা। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ডাটাবেজ, স্মার্ট আইডি কার্ড, জিও-ট্যাগিং ইত্যাদি ব্যবহার করে হকারদের সঠিকভাবে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু ঢাকার সিটি কর্পোরেশনগুলো এই প্রযুক্তিগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি। ফলে তথ্যের ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব রয়েছে। হকারদের নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন বা প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করা হয় না। ফলে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না এবং বাস্তবায়নের সময় বাধার সম্মুখীন হয়। একটি টেকসই সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এখন প্রশ্ন হলোÑএই সমস্যাগুলোর সমাধান কী হতে পারে? প্রথমত, একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল হকার তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন এবং হকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত আপডেট নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উচ্ছেদের আগে বিকল্প স্থান নির্ধারণ, মার্কেট বা নির্দিষ্ট জোন তৈরি এবং সেখানে হকারদের বসার ব্যবস্থা করতে হবে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নীতি পরিত্যাগ করতে হবে। তৃতীয়ত, সমন্বয় জোরদার করতে হবে। সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো দ্বৈত নীতি বা বিভ্রান্তি না থাকে। চতুর্থত, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার সময় হকারদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি দেখাতে হবে এবং তাদের ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নগর উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে হকারদের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা শহরের শৃঙ্খলা ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। ষষ্ঠত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল আইডি, মোবাইল অ্যাপ এবং ডাটাবেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে হকারদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান উদ্যোগগুলোতে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও, বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের কারণে সেগুলো কার্যকর হবার সম্ভাবনা কম। হকার সমস্যা কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। একটি সমন্বিত, মানবিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। অন্যথায় উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের এই চক্র চলতেই থাকবে, এবং এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণি-হকাররা।