দেশে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর দ্রুত বিস্তার এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। রাজধানীর বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের করুণ চিত্র কেবল একটি হাসপাতালের সংকট নয়; এটি বৃহত্তর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই শত শত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-অনেক শিশু অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতালে থেকেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদি এই অভিযোগের বাস্তবতা থাকে, তবে তা হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে রোগী ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্কতা অপরিহার্য। আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হলেও রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইসিইউ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, যেখানে গুরুতর অসুস্থ শিশুরাও সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। তবে এই সংকটের পেছনে শুধু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করলে পূর্ণ চিত্রটি পাওয়া যাবে না। চিকিৎসকরা যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলছেন তা হলো-সময়মতো টিকাদান না হওয়া এবং অপুষ্টি। হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, এবং নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু টিকাদানে অনীহা, সচেতনতার অভাব কিংবা সেবার অপ্রতুলতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, যেসব শিশু আগে থেকেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অন্যান্য জটিল রোগে ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে হামের সংক্রমণ মারাত্মক হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, সামগ্রিক শিশুস্বাস্থ্যের দুর্বলতাও এই মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করে প্রতিটি শিশুকে এর আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল বাড়াতে হবে, যাতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-জনসচেতনতা বৃদ্ধি। অভিভাবকদের মধ্যে টিকা গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে না পারলে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব বারবার ফিরে আসবে। শিশুদের এই অসহায় কষ্ট এবং অভিভাবকদের উদ্বেগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামো নয়, বরং সুশাসন, পরিকল্পনা ও সচেতনতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।