প্রশাসনিক সংস্কার

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

এফএনএস
| আপডেট: ৮ মে, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম | প্রকাশ: ৮ মে, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

দেশের প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, বাস্তবতা তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়-এমন একটি চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বহুল আলোচিত প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব, বিশেষ করে আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ, কার্যত বাস্তবায়নের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার যে অঙ্গীকার ছিল, তা এখনো অধরাই। প্রশাসন নিয়ে অন্যতম বড় অভিযোগ হলো এর ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী মানসিকতার ধারাবাহিকতা। শাসনব্যবস্থা বদলালেও প্রশাসনের চরিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ‘লালফিতা’র সংস্কৃতি হয়তো রূপ বদলেছে, কিন্তু সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি, ফাইল আটকে ঘুষ আদায় এবং অনিয়মের অভিযোগ এখনও বহাল রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে-সেবা পেতে হলে এখনও অনানুষ্ঠানিক লেনদেন প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে এমনটাই দৈনিক প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে। প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব ও দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগও সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগ ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে-সংস্কারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা দৃঢ়? এদিকে, প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার প্রশ্নও নতুন নয়। অতীতের বিভিন্ন সরকার আমলাতন্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে-এমন অভিযোগ রয়েছে বিশ্লেষকদের। ফলে প্রশাসন একটি নিরপেক্ষ সেবামূলক কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ থেকেছে। এই ধারাবাহিকতা ভাঙতে না পারলে সংস্কারের কোনো উদ্যোগই স্থায়ী ফল দেবে না। আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী কমিশনের সুপারিশগুলো এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এবং শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সেখানে। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা আগের মতোই রয়ে গেছে। প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কেও একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আচরণে কর্তৃত্বপরায়ণতা এবং নাগরিকদের প্রতি অবজ্ঞার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রশাসন যদি সেবাদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে, তবে জনআস্থা পুনর্গঠন কঠিন হবে। তবে ইতিবাচক দিক হলো-নীতিনির্ধারকরা প্রশাসনকে দক্ষ ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকারোক্তির চেয়ে বাস্তবায়নই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ। সংস্কারকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে। প্রশাসনিক সংস্কার কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। এর সফলতা নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বোপরি জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। অন্যথায়, সংস্কারের প্রস্তাব কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর নাগরিকদের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাবে।