হাওরের কৃষক বাঁচাতে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

এফএনএস | প্রকাশ: ১১ মে, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
হাওরের কৃষক বাঁচাতে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে এই অঞ্চল থেকে যে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদিত হয়, তা জাতীয় খাদ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু এবারের বোরো মৌসুমে আকস্মিক বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে হাওরের কৃষক আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ধান কেটে ঘরে তুলেও তারা স্বস্তিতে নেই; বরং ভেজা ধান শুকাতে না পেরে নতুন সংকটে পড়েছেন। টানা বৃষ্টি ও রোদহীন আবহাওয়ার কারণে হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক ধান শুকানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। খলা তলিয়ে গেছে, খোলা জায়গা পানিতে ডুবে আছে, আর পর্যাপ্ত ড্রাই মেশিনও নেই। ফলে কাটা ধানেই অঙ্কুর গজাচ্ছে, অনেক ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকার ধান সংগ্রহের ঘোষণা দিলেও নির্ধারিত আর্দ্রতার শর্ত পূরণ করতে না পারায় অধিকাংশ কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। বাস্তবে এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমস্যা নয়; এটি প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। হাওরাঞ্চল প্রতি বছরই আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিতে থাকে। তবু ধান শুকানোর অবকাঠামো, পর্যাপ্ত হারভেস্টার, সংরক্ষণব্যবস্থা কিংবা জরুরি সহায়তার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। এবারও কৃষকেরা অভিযোগ করেছেন, ডিজেল সংকট, শ্রমিক সংকট এবং সময়মতো যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় অনেক ক্ষেতের ধান কাটাই সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতিও কৃষকের জন্য হতাশাজনক। খোলাবাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেছে। মধ্যস্বত্বভোগী চক্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনছে। ফলে একদিকে কৃষক ক্ষতির মুখে, অন্যদিকে ভোক্তা বা বাজার ব্যবস্থাও স্থিতিশীল নয়। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে-ড্রাই মেশিন পাঠানো, শ্রমিক সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতার তুলনায় এসব উদ্যোগ এখনো অপ্রতুল। হাওরের মতো দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের জন্য আলাদা কৃষি ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োজন। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী ধান শুকানোর কেন্দ্র, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃষকের জন্য সহজ শর্তে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিঃস্ব না হন, তা নিশ্চিত করা। কারণ হাওরের কৃষক শুধু নিজের জীবিকার জন্য নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও লড়াই করেন। সেই কৃষক যদি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপরই পড়বে। তাই হাওরের কৃষককে বাঁচানো মানে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখা।