টার্গেট কিলিং

প্রতিরোধহীন সহিংসতার নগরী কি চট্টগ্রাম?

এফএনএস | প্রকাশ: ১২ মে, ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম
প্রতিরোধহীন সহিংসতার নগরী কি চট্টগ্রাম?

চট্টগ্রাম নগরীতে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। গত ২০ মাসে অন্তত ৩০টি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই ইঙ্গিত দেয় না, বরং প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা হত্যার আগে হুমকি পেয়েছিলেন, থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন; কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। হাসান রাজু, ঢাকাইয়া আকবর কিংবা সরোয়ার বাবলার মতো একাধিক ঘটনার বর্ণনায় একটি সাধারণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে-প্রথমে হুমকি, পরে অভিযোগ, তারপর হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর পুলিশি তদন্তের আশ্বাস মিললেও আগাম প্রতিরোধের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আস্থাহীনতা বাড়ছে। জিডিকে যদি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নথিতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে তা নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। হুমকির অভিযোগ পাওয়ার পর সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারি, স্থানীয় বিরোধ বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আধুনিক পুলিশিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ফলে জিডি পরে মামলার নথি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও প্রাণহানি ঠেকানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংকেন্দ্রিক সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও কার্যকর অভিযান না থাকায় অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে একটি কাঠামোগত সমস্যাও স্পষ্ট-প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশিংয়ের পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক পুলিশিংয়ের ঘাটতি। কোনো ঘটনা ঘটার পর অভিযান, গ্রেপ্তার ও তদন্তের চেয়ে সম্ভাব্য সহিংসতা আগে থেকে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করাই হওয়া উচিত মূল অগ্রাধিকার। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস, অস্ত্রের ব্যবহার ও প্রতিশোধমূলক হামলার প্রবণতা রয়েছে, সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার, হুমকিসংক্রান্ত জিডির বাধ্যতামূলক তদন্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের জন্য প্রতিটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান বিচারপ্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। এই নগরী যদি ভয়, প্রতিশোধ ও টার্গেট কিলিংয়ের সংস্কৃতিতে আক্রান্ত হয়, তবে তা শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার নয়, জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্যও অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারে।