বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ করাতকল (স্ব-মিল)। বন বিভাগের নজরদারির অভাব ও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে এসব করাতকল দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে অন্তত ১৫টির বেশি করাতকল বিভিন্ন হাট-বাজার, জনবসতি ও সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে। এছাড়া প্রায় ৩০টির অধিক ইটভাটার ভেতরেও অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে করাতকল। এসব করাতকলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঠ চেরাই করে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, অধিকাংশ করাতকল দিন-রাত সচল থাকায় আশপাশের এলাকায় তীব্র শব্দ দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। করাতকল থেকে উড়ে আসা কাঠের গুঁড়া ও ধুলাবালুর কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, এলার্জি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। অনেকেই নিজ বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, একটি করাতকল বৈধভাবে পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের ভূমি সংক্রান্ত অনুমোদন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এছাড়া বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া করাতকল স্থাপন বা পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে বাবুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক করাতকল। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় অবৈধভাবে গাছ কেটে কাঠ চেরাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক বনায়ন ও গ্রামীণ সড়কের পাশের গাছ কেটে এসব করাতকলে আনা হচ্ছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
রিবেশবাদীরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে করাতকল স্থাপনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, বায়ুদূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর ফলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পেয়ে জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ করাতকলগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রশাসনের অভিযান বা নজরদারি অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ী বাবুগঞ্জ উপজেলা বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বাবুগঞ্জে বর্তমানে কতটি বৈধ করাতকল রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তালিকা এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। তবে অবৈধ করাতকলগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা জানান, উপজেলা বন কর্মকর্তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে বৈধ ও অবৈধ করাতকলের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ করাতকলের তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ করাতকল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত অভিযান, নিয়মিত মনিটরিং এবং বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।