বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভুল প্রশ্ন সেটে পরীক্ষা গ্রহণের ঘটনায় নতুন করে একের পর এক অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। কেন্দ্র সচিবের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগের পাশাপাশি এবার হল সুপারের পরীক্ষা চলাকালে ছুটিতে ঢাকা অবস্থান এবং অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে।
রোববার (১০ মে) অনুষ্ঠিত সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সব কেন্দ্রে নির্ধারিত ১ নম্বর সেট ‘কর্ণাক’-এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩ নম্বর সেট ‘লুক্সর’-এ পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে সন্ধ্যায় বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
শিক্ষা বোর্ড ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের আওতায় ছোটবিঘাই অফিসেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারি, পটুয়াখালী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শের-ই-বাংলা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং হেতালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মোট ৩৮২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পরীক্ষার্থীরা নির্ধারিত সেটের পরিবর্তে অন্য সেটে পরীক্ষায় অংশ নিলেও পরীক্ষা চলাকালে বিষয়টি কারও নজরে আসেনি। এ ঘটনায় কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির গঠন ও দায়িত্ব পালন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইব্রাহিম খলিল এবং হল সুপার ছিলেন বাবুল আখতার। এছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সাঈদুল হক আজাদ, শাহ আলম ও রুবেল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, হল সুপার বাবুল আখতার পরীক্ষার মধ্যেই ছুটি নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। শিক্ষা বোর্ডের বিধি অনুযায়ী পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে হল সুপারের ছুটি নিতে হলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অনুমতি প্রয়োজন হয় এবং স্টেশন লিভের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশেষ জরুরি কারণ ছাড়া পরীক্ষাকালীন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ছুটি দেওয়ার বিধান নেই।
অন্যদিকে কমিটির সদস্য রুবেল হোসেনের চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া কোনো নবাগত শিক্ষককে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে ভুলপথে পরিচালিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও ঐসকল ব্যক্তিদের পরিক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জিএম শহিদুল ইসলাম জানান, বোর্ড বিষয়টি অবহিত হয়েছে এবং যে প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই প্রশ্ন অনুযায়ীই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হবে। এতে পরীক্ষার্থীদের ফলাফলে কোনো সমস্যা হবে না। তবে এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। কেন্দ্রের সুপার, সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পত্র পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা বোর্ড বা প্রশাসনকে না জানিয়ে গোপন রাখেন। পরে জেলা প্রশাসন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগ নেয়। বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে ইব্রাহিম খলিল ফোন কল কেটে দেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তারেক হাওলাদার বলেন, কেন্দ্র সুপার, সচিব, ট্যাগ অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলা ও অপেশাদার আচরণের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ব্যবস্থা নিতে পত্র পাঠানো হবে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০০৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পটুয়াখালী-(১০০) কেন্দ্রে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড কেন্দ্রটি বাতিল করে এবং পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিবর্তে পটুয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরবর্তী পাঁচ বছর এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময়ের শিক্ষা বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন সহকারী শিক্ষক ইব্রাহিম খলিলসহ ছয়জন শিক্ষককে অবশিষ্ট চাকরিকাল পর্যন্ত শিক্ষা বোর্ডের সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বোর্ডের নথিতে ইব্রাহিম খলিলকে ওই পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছিল। দুই দশক পর আবারও একই বিদ্যালয় কেন্দ্রকে ঘিরে ভুল প্রশ্ন সেটে পরীক্ষা গ্রহণ, তথ্য গোপন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতি এবং কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।