টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বিষাক্ত বর্জ্য ও দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানিতে আশপাশের খাল-বিল ও নাফ নদ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে প্রবহমান খালগুলো দিয়ে এই দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী খাল, মুচনী ছুরি খাল, জাদীমুরা জাদীর খাল ও ওমর খালের পানি এখন পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী। ক্যাম্পের লিকুইড বর্জ্য ও মলমূত্র খালের পানির সঙ্গে মিশে কালো রং ধারণ করেছে। অথচ এক সময় শুষ্ক মৌসুমে এই খালের পানি দিয়েই স্থানীয় কৃষকরা চাষাবাদ করতেন। পানির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ায় এখন তারা ক্ষেত-খামারে পানি দিতে পারছেননা। পরিবেশ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা।
লেদা এলাকার লবণ চাষি জুবায়ের জানান, পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত এই পানি লবণ মাঠে ব্যবহার করা যায়না। কারণ এতে লবণ উৎপাদন হয়না। ক্যাম্পের বর্জ্যরে কারণে নাফ নদীর জোয়ারের পরিষ্কার পানিও খালে ঠিকমতো ঢ়ুকতে পারছেনা। ফলে প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন চাষিরা। হ্নীলা ইউনিয়নের মাত্র ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। ক্যাম্প সূত্র জানায়, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট রয়েছে ২৭ নম্বর ক্যাম্পে। যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বাকি ৪টি ক্যাম্পে কোনো ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এনজিও কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের সৃষ্ট গৃহস্থালি বর্জ্যরে মাত্র ৩০ শতাংশ এনজিওগুলো ব্যবস্থাপনা করছে। বাকি ৭০ শতাংশ বর্জ্য, বিশেষ করে শৌচাগারের লিকুইড বর্জ্য সরাসরি খালের মাধ্যমে প্রকৃতিতে মিশছে।
লবণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসাইন মুহাম্মদ আনিম জানান, বর্জ্য দূষণের কারণে আলীখালী, লেদা ও মুচনী এলাকায় লবণ উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। চাষিরা সেচ দিতে পারছেননা, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ক্যাম্পের আবর্জনায় খালের পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে। এই পানি ফসল উৎপাদনের জন্য বিষতূল্য। আমরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
টেকনাফ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ক্যাম্পের বর্জ্য আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় শোধনাগার বা ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। অন্যথায় স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।
এ বিষয়ে ২৪ ও ২৫ নম্বর ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান বলেন, অল্প জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি ক্যাম্পে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা গেলে আশপাশের পরিবেশ ও খাল-বিল দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।