দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও বেগবান এবং টেকসই করতে হলে তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের (জয়পুরহাট-বগুড়া) সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি। তিনি তরুণদের শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও তরুণদের সম্ভাবনা
এমপি সুরাইয়া জেরিন রনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান জনমিতিক কাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশকে যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারা যায় তবে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না। তবে দক্ষ মানবসম্পদ ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবক হতাশায় ভুগছেন উল্লেখ করে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি যদি তরুণদের যুগোপযোগী ও কারিগরি প্রশিক্ষণ না দেওয়া যায়, তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের জন্য সম্পদ না হয়ে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তাদের জন্য অবিলম্বে প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসূচি, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
বহুমুখী কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার
চাকরিপ্রার্থীদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়ে সুরাইয়া জেরিন রনি বলেন, প্রথাগত সরকারি বা করপোরেট চাকরির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট না করে তরুণদের আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাকরি খোঁজার চেয়ে চাকরি দাতা হওয়া অনেক বেশি গৌরবের। আমাদের তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। সরকার এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মেয়াদি প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালু করেছে। এসব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে স্বাবলম্বী হতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বর্তমান সরকার যুববান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (ঝগঊ), স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে এসব খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
নারী ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতি
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নারীদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি। সুরাইয়া জেরিন রনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো জাতির পক্ষে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ) অর্জন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। নারী ও যুবসমাজ যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক রূপান্তর ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জয়পুরহাট-বগুড়া অঞ্চল নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা
জয়পুরহাট ও বগুড়া অঞ্চলের ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে সংসদ সদস্য রনি বলেন, এই অঞ্চলটি ঐতিহ্যগতভাবেই কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি এ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন করা, স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য একটি 'সমন্বিত আঞ্চলিক পরিকল্পনা' গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তিনি আশ্বাস দেন যে, জয়পুরহাট ও বগুড়ার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে তিনি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা পালন করবেন।
হতাশা দূর করে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার আহ্বান
তরুণদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিয়ে এমপি রনি বলেন, কর্মসংস্থানের অভাব বা সাময়িক ব্যর্থতায় হতাশ হওয়া চলবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশপ্রেম, সততা আর কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। একজন তরুণ যদি এই তিনটি গুণ বুকে ধারণ করে এগিয়ে যায়, তবে সে শুধু নিজেকেই প্রতিষ্ঠিত করবে না, বরং দেশের সার্বিক উন্নয়নেও এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারবে।
সুশীল সমাজ ও অংশীজনদের প্রতিক্রিয়া
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সংসদ সদস্যের এই সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনাকে সাধুবাদ জানান। বর্তমান সময়ে গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষিত ও অর্ধ-শিক্ষিত বেকারদের জন্য বাস্তবমুখী কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তারা সুরাইয়া জেরিন রনির এই সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনগুলোতে যুব উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের এই ধারাকে বজায় রাখতে তিনি আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন দেখতে চান সাধারণ মানুষ।