খুলনা নদীবন্দরের আওতাধীন মহেশ্বরপাশা দৌলতপুর নগর ঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি খেয়াঘাটের টেন্ডার প্রক্রিয়ার ওপর মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করে বারাকপুর খেয়াঘাটের বিতর্কিত ইজারা সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে বিআইডব্লিউটিএ-এর বিরুদ্ধে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান ও ইজারা প্রদানের এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি আদালত অবমাননা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা। শুধু তাই নয়, এই ইজারা প্রক্রিয়াটি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে সম্পন্ন হওয়ায় সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি টেন্ডারের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ০৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ-এর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালকের ইস্যু করা দরপত্র বিজ্ঞপ্তি এবং পরবর্তীতে ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপ-পরিচালক (ইজারা) কর্তৃক প্রকাশিত সম্পূরক টেন্ডার ইনডেক্সের কার্যকারিতার ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আট সপ্তাহের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) প্রদান করেন। সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর- ৩১৫৮/২০২৪-এর প্রেক্ষিতে মহামান্য আদালতের বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক এই আদেশ দেন। শেখ আলী আকবরের দায়ের করা এই পিটিশনে রূপসা ফেরী ঘাট, কাস্টমস ফেরী ঘাট, কালীবাড়ী ফেরী ঘাট, মহেশ্বরপাশা দৌলতপুর ফেরী ঘাট, হার্ডবোর্ড/চন্দনী মহল ফেরী ঘাট এবং বারাকপুরঘাট ফেরী ঘাটের দরপত্র স্থগিতের আবেদন জানানো হয়েছিল। আদালতের এই স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান ও পরবর্তী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আদালতের নির্দেশের চরম অবমাননা শামিল।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলমান এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তীব্র সিন্ডিকেট বা বলয় তৈরির চিত্রও ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা কার্যালয়, বিআইডব্লিউটিএ খুলনা কার্যালয় এবং খুলনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়সহ মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দরপত্র বিক্রয় এবং টেন্ডার বক্স স্থাপন করা হয়েছিল। যেমন বারাকপুর খেয়াঘাটের সর্বমোট ১১টি দরপত্র বা সিডিউল বিক্রি হলেও সিন্ডিকেটের একচেটিয়া প্রভাব ও কারসাজির কারণে টেন্ডার বক্সে মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়ে। বাকি ১০টি দরপত্রদাতাকে রহস্যজনকভাবে টেন্ডার বক্সে সিডিউল ফেলতে বাধা দেওয়া হয়েছে অথবা সমঝোতা করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর ফলে প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে মেসার্স নোভা এন্টারপ্রাইজ নামক একটি প্রতিষ্ঠান একমাত্র দরপত্রদাতা হিসেবে ইজারা পেয়ে যায় । এই ঘাটের জন্য সরকারি প্রাক্কলিত মূল্য বা সরকারি রেট নির্ধারণ করা ছিল ৯ লক্ষ টাকা। সেখানে মেসার্স নোভা এন্টারপ্রাইজ ,মাত্র ৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকায় (যাহার সহিত ১৫% মূসক এবং ১০% আয়কর প্রযোজ্য)এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটের ইজারা প্রাপ্ত হয়। উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার হলে যেখানে সরকারের রাজস্ব আয় আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ ছিল, সেখানে মাত্র একটি দরপত্রের ভিত্তিতে ইজারা চূড়ান্ত করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি নিশ্চিত হয়েছে। ৪টি পৃথক স্থানে টেন্ডার বক্স রাখার মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে সেই নিরাপত্তাবলয় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। একদিকে মহামান্য আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে আইন লঙ্ঘন, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একক দরপত্রে নামমাত্র মূল্যে ইজারা প্রদান-এই দুইয়ে মিলে বিআইডব্লিউটিএ-এর গোটা প্রক্রিয়াটি এখন গভীর বিতর্কের মুখে পড়েছে।