পিতার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ৪ সন্তান

এফএনএস, মো. আতাউর রহমান, পত্নীতলা (নওগাঁ): | প্রকাশ: ৩০ মে, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
পিতার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ৪ সন্তান

আব্দুর রহমান। রহমান মাষ্টার নামে যাকে এক নামেই চিনতো এলাকার সর্বশ্রেণীর মানুষ। একাধানে ইংরেজী, বাংলা, আরবী, হিন্দী আর উর্দুতে সমান পারদর্শী হওয়ায় এলাকার গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো তাঁর নাম। সর্ব বিষয়ে পারদর্শী এই শিক্ষকের গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার হাসানবেগপুর গ্রামে। শিক্ষকতা পেশার কারণে তিনি উপজেলার পৌরসদর নজিপুর ভাড়া বাসায় কখনও একা আবার কখনও পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করতেন। তাঁর কাছে পড়াশুনা করে পত্নীতলা উপজেলার অনেকেই আজ এলাকার প্রতিষ্ঠীত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্য উচ্চ পদস্থ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। বিশেষত তাঁর কাছে সন্তানদের ইংরেজী শেখানোর জন্য অভিভাবকরা তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। আর তিনিও পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের উজাড় করে পাঠদান করাতেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি পত্নীতলা উপজেলার দেবরপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও গগনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষক হিসাবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী হলেও ব্যক্তি আব্দুর রহমান ছিলের জীবণের প্রতি চরম উদাসীন আর অলস। আর এ কারণে তিনি নিজের যোগ্যতা আর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের আর পরিবারের জন্য কিছু করতে পারেননি। ২০১০ সালের ১লা অক্টোবর তিনি স্ত্রী আর নাবালক ৪জন সন্তান রেখে পরপারে পাড়ি জমান। এ সময় তাঁর বড় ছেলে সুমন আহমেদ এর বয়স ছিলো ১২বছর।


২০১০  সালে শিক্ষক  আব্দুর রহমান মারা যাওয়ার পর তাঁর শ্যালক তথা সুমন আহমেদ এর মামা তাদের পরিবারের হাল ধরেন। এদিকে পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য ছোট্র সুমন আহমেদ পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে অন্যের দোকানে কর্মচারীর কাজ নেন। নিজে কাজ করে এবং মামার সহযোগিতয় তিনি ছোট ৩ ভাই বোনের পড়ালেখা চালিয়ে নেন। থাকার জন্য বেছে নেয় উঁচু বিল্ডিং এর নীচে একটি পরিত্যক্ত জায়গা। শিক্ষক পিতা পরিবারের জন্য কোন সম্পদ রেখে না যাওয়ায় এভাবেই সংগ্রাম করে তিনি ভাই-বোনদের পড়ালেখা করান। বর্তমানে সুমন আহমেদের বয়স প্রায় ৩০বছর। একটি কোম্পানীর বিপনন প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন। ছোট ভাই গোলাম সাকলায়েনকে (২৭) তিনি কষ্ট করে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন। সে ডাকার একটি কোম্পানীতে আউটসোর্সিং এর কাজ করছেন। মেঝ বোন নাহিদ সুলতানার বয়স ২৫ বছর। যিনি আনছার ওয়ার্ড লিডার এবং ছোটবোন শিমু আরা (২২) উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ালেখা করছেন। জীবণের চাকার হিসাব মিলাতে গিয়ে সুমন আহমেন আর্থিক সংকটের কারণে নিজে বিয়ে করতে পারেননি এবং কোন ভাই বোনকেও বিয়ে দিতে পারেননি। 

আব্দুর রহহমান স্যারের ছেলে সুমন আহমেদ আলাপচারিতায় জানান, পিতা বেঁচে থাকতে তিনি পিতার মুখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অনেক গল্প শুনেছেন। ছোট বেলা বাবাকে বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসতে দেখেছেন। ২০১০ সালে পিতা মারা যাওয়ার পর ২০১৭ সালে তিনি মরহুম পিতার রেখে যাওয়া ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে একটি কাগজ দেখতে পান। সেখানে দেখা যায়  নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড যার নিবন্ধন নম্বর-২৩/১৯৯৮ গত ১৮ এপ্রিল ১৯৯৯ তারিখে মরহুম আব্দুর রহমান মাষ্টারকে একটি পত্র প্রেরণ করে এবং ৮ মে ১৯৯৯ তারিখে উপস্থিত হয়ে সমিতিতে নাম অন্তর্ভূক্তির জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু সে সময় আব্দুর রহমান জটিল অসুস্থ্যতাজনিত কারণে নির্ধারিত দিনে সমিতিতে উপস্থিত হয়ে নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেননি। সুস্থ্য হওয়ার পর নির্ধারিত তারিখের প্রায় ১মাস পর তিনি সমিতিতে যোগাযোগ করলেও কর্ত্তৃপক্ষ সে সময় সেটা আর আমলে নেয়নি। 

মরহুম শিক্ষক আব্দুর রহমানের ছেলে সুমন আহমেদ এই প্রতিবেদককে আরো জানান, নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতির কাগজ হাতে আসার পর তিনি সেসময় পত্নীতলা উপজেলার তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সাইদুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইছাহাক আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আলীর নিকট বার বার ধর্ণা দিয়েছেন। সে সময় পিতাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম তালিকাভুক্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য কিছু খরচের কথা তারা বলেন। কিন্তু প্রত্যাশিত অংকের খরচ বহন করার সামর্থ্য না থাকায় তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মরহুম পিতার নাম অন্তর্ভূক্ত করাতে অপারগ হন। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নিয়ে তিনি বর্তমান উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তারা কাজী, উপজেলা বিএনপি’র নেতা নওয়াব আলী, আব্দুল কাদেরসহ অনেকের সাথে দেখা করে সহায়তা চেয়েছেন। বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেছেন। 

এ বিষয়ে সুমন আহমেদ বলেন, আমার পিতা এলাকার একজন নামকরা শিক্ষক ছিলেন। তিনি শুধু সমাজকে দিয়েই গেছেন। বিনিময়ে কিছু সমাজের কাছ থেকে নেননি। তিনি এতোটাই উদাস ছিলেন যে, নিজের মুক্তিযোদ্ধার সনদটিও গ্রহণ করেননি। আমরা তার ৪সন্তান জীবণ সংগ্রাম করে একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে গেছি। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রায় ১০ বছর ধরে আমি স্থানীয় নেতৃবৃন্দের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি পিতার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভের জন্য। আমরা যেভাবে জীবণযাপন করছি সেভাবেই করবো। আমাদের কোন সরকারি আর্থিক সহযোগিতা দরকার নেই। আমরা শুধু মরহুম পিতার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাই।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে