বাজেটের লক্ষ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান

এফএনএস | প্রকাশ: ১৫ জুন, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
বাজেটের লক্ষ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন ছিল, তেমনি বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি এত দ্রুত কমিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, বরং জনজীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক হলো মানব উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়াও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল অর্জিত হয়নি। প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। সুতরাং, নতুন সরকারের জন্য এই বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র। বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং বাস্তবায়নের গুণগত মানে নিহিত। যদি ঘোষিত সংস্কার, বিনিয়োগ সহায়তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর করা যায়, তবে এই বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।