তিস্তায় বিলিন ফসলি জমি নিরব পানি উন্নয়ন বোর্ড

এফএনএস (মোঃ ইমদাদুল হক; সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা) : | প্রকাশ: ১৬ জুন, ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
তিস্তায় বিলিন ফসলি জমি নিরব পানি উন্নয়ন বোর্ড

        বর্ষন ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভাঙনে শতাধিক বসতভিটা, তিন শতাধিক একর ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট বিলিন হয়েছে তিস্তার গর্ভে। ভাঙনের মুখে পড়েছে দুই শতাধিক বসতভিটা , শত শত একর ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়টি এখন ভাঙনের মুখে। বিশেষ করে কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চন্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে ভাঙন চরম আকার ধারন করেছে।  স্থানীয় এমপি মো. মাজেদুর রহমান ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সাথে কথা বলেছেন। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই কোন মাথা ব্যাথা। নাকাওয়াস্তে কয়েকটি স্থানে ভাঙন রোধে ফেলা হচ্ছে জিত ব্যাগ।

        কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন কখন বসতভিটা নদীগর্ভে বিলিন হবে তা নিয়ে দিশেহারা চরের মানুষ। তিনি বলেন, সারা বছর কমবেশি নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সরকারি ভাবে নদী ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা দিয়ে ভাঙন রোধ সম্ভাব হচ্ছে না। স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধ করার দাবি চরবাসির।

         সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ বসতভিটা, ৬০০ হেক্টর ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান তিস্তায় বিলিন হয়ে যাচ্ছে। সে মোতাবেক গত ৫ বছরে আড়াই বসতভিটা, তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি, ৫০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট, ৩০টি ধর্মীয় ও ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে ভাঙন কবলিত পরিবারের জন্য ত্রান বিতরণ করা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি। 

         হরিপুর ইউনিয়নের লখিয়ারপাড় গ্রামের মো. জরিফ মিয়া বলেন চরের প্রতিটি মানুষের বসতভিটা কমপক্ষে ৫ হতে ৮ বার ভাঙনের শিকার হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সারা বছর নদী ভাঙন চলমান রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন  চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নামকাওয়াস্তে সরকারি ভাবে ভাঙন রোধে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন রক্ষা হচ্ছে না। 

        নাজিমাবাদ বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন উজানের পলি জমে নদী ভরে গিয়ে তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সেই কারনে তিস্তা অসংখ্য শাখা নদীতে রুপ দিয়েছে । সে কারনে সময় এবং অসময়ে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধ করতে না পারলে চরের মানুষের কষ্ট কোন দিন দুর হবে না।   

       কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, পানি কমলে উজানে আর পানি বাড়লে ভাটিতে ভাঙন দেখা দেয়। বর্তমানে ভাঠিতে এবং উজানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধে দীর্ঘদিন হতে বিভিন্ন সংগ্রাম পরিষদ, এনজিও সংস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি কাজ করলেও আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি চরবাসি। নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টের সীমা নেই। তার ইউনিয়নের সবগুলো ওয়ার্ড নদীর চরে। চরের একটি পরিবার বছরে ৪ হতে ৫ বার নদী ভাঙনের কবলে পরে থাকেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে তেমন কোন সাহায্য সহযোগিতা করা হয় না। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা জরুরী হয়ে পরেছে। 

      কাপাশিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং, সংরক্ষণ, মেরামত এবং শাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ করা সম্ভাব নয়। নদী খনন ও ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ একমুখি করলে নদী ভাঙন কমে যাবে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও টিউব ও জিও ব্যাগ এখন কোন কাজে আসছে না। চরের মানুষের হা-হাকার দুর করতে হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের ওপর মহলের নিকট জোর দাবি জানান। তা না হলে এই উপজেলার মানচিত্র পরিবর্তন হয়ে যাবে। 

          তিস্তার চরাঞ্চল এখন কৃষিতে একটি সম্ভাবনাময় জোন। ধান, গম, ভূট্টা, বাদাম, কুমড়া, তরমুজ, আলু, মরিচ, পিয়াজসহ নানাবিধ ফসল চাষাবাদের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে তিস্তার বালু চর। কিন্তু প্রতিবছরের ভাঙন চরের কৃষকদের স্বপ্ন নষ্ট করে দিচ্ছে বলেন উপজেলা কৃষি অফিসার মো. কাইয়ুম চৌধুরী। প্রতিবছর ভাঙনে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে বাঙন রোধের ব্যবস্থা করলে চরের কৃষকরা দারুনভাবে সাবলম্বী হয়ে উঠবে। 

          উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে তিস্তা নদী প্রবাহিত। প্রতিবছর নদী ভাঙনে প্রায় ৪০০ বসতভিটা এবং ৩০০ হেক্টর জমি, রাস্তাঘাট, প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলিন হয়ে থাকে। ভাঙনের বিষয়ে সবসময় তথ্য পাঠানো হয়ে থাকে।

          গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্থায়ী ভাবে ভাঙন রোধ সরকারের ওপর মহলের সিদ্ধানের ব্যাপার। এখানে তাদের করার কিছুই নাই। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব, জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ওপর মহলে তথ্য প্রদান ছাড়া আর কোন কাজ নেই তাদের। নদী খনন, ড্রেজিং , শাসন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভাব নয়। 

         স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, বেশ কয়েকটি চরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি পরিদর্শন করে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন। আপাতত পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ হতে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে