প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করে তুলতে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ধারাবাহিক শ্রেণিকক্ষ ও মাঠভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে ‘কমিপ্রহেন্সিভ নেচার লার্নিং টু অ্যাক্টিভেট স্কুল চিলড্রেন’ প্রকল্প। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির উদ্যোগে ০৬ দিনব্যাপী সিংড়া জাতীয় উদ্যানে পৃথকভাবে ৬টি ফিল্ড ট্রিপ অনুষ্ঠিত হয়। ফিল্ড ট্রিপে অংশ নেয় বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের চাউলিয়া মিশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নন্দগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সিংড়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম-পঞ্চম শ্রেণির মোট ১৯৬ জন শিক্ষার্থী। শ্রেণিভিত্তিক প্রয়োজন ও বয়স বিবেচনায় প্রথম-দ্বিতীয় এবং তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
শিক্ষার্থীরা ফিল্ড ট্রিপে পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের খাদ্যাভাস, পরিবেশে ভূমিকা, জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও বিদ্যমান হুমকি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। ট্রিপগুলোতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রকল্প কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে চাউলিয়া মিশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বীরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. শাহজিদা হক। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে শিশুদের সচেতন করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি মাঠভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়। এ ধরনের উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপোরার ও প্রকল্পের লিডার রেজভীন আক্তার বলেন, সিংড়া জাতীয় উদ্যান ও শালবন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা সম্ভব। গত কয়েক মাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ে আগ্রহ ও সচেতনতার ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
সিংড়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিজেন্দ্র নাথ দাস বলেন, শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে বাস্তব পরিবেশ থেকে শেখার সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত উৎসাহিত। বিশেষ করে স্থানীয় বন, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে তাদের আগ্রহ উলেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বিকাশেও সহায়ক। ১৮ মাস মেয়াদি প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের জুন মাসে। তবে বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিবেশ শিক্ষা ও সচেতনতামূলক মূল কার্যক্রম শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে। প্রকল্পটির লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা এবং সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। প্রকল্পটি স্থানীয় বাঙালি ও আদিবাসী সাঁওতাল সমপ্রদায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ৯৬টিরও বেশি শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা সেশন এবং ১২টিরও বেশি ফিল্ড ট্রিপ পরিচালিত হয়েছে। এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা ইন্টারক্টেভি শিখন পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছে। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সেশনগুলোতে বিষয়ভিত্তিক পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা, অনুশীলনী, কুইজ ও শিক্ষামূলক গেম পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র ও শিক্ষামূলক ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিবেশ শিক্ষা আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। পূর্ববর্তী ফিল্ড ট্রিপগুলোতে শিক্ষার্থীরা উদ্ভিদ সম্পর্কে জেনেছে এবং উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করেছে। সংশিষ্টদের মতে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শিশুদের সম্পৃক্ত করে তোলার মাধ্যমে একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।