‘মাদককে বর্জন করি, সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কুমিল্লাকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয়ে মানববন্ধন করেছে নাগরিক অধিকার ফোরাম, কুমিল্লা। সমাজে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধ, তরুণ প্রজন্মকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির দাবিতে মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টায় নগরীর কান্দিরপাড় টাউন হল গেটের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে মাদকের গডফাদার, অর্থের জোগানদাতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
কুমিল্লা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু বলেন, মাদক আজ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, পরিবারের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক হাজী মোস্তাক মিয়া বলেন, বিগত ১৭ বছরে রাজনীতির নামে বিরাজনীতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন এলাকায় গডফাদারভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের কারণে মাদক ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে। এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ ভুলে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বজনীন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে শুধু মুখের জিরো টলারেন্স নয়, দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তিনি।
এ সময় মানববন্ধনে নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সভাপতি ডা. আব্দুল লতিফের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদা এমরানের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লার নায়েবে আমীর মোসলেহ উদ্দিন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান, নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যক্ষ মো. শরীফুল ইসলাম, কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সফিকুল আলম হেলাল, ব্রাহ্মণপাড়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ খলিল উদ্দিন আখন্দ, বাপা কুমিল্লার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম, কুমিল্লা টাউন হলের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল কবীর সাজ্জাদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লা মহানগরের সহকারী সেক্রেটারি কামরুজ্জামান সোহেল, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি এনামুল হক ফারুক,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কুমিল্লার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত দাস টিটু, মানবাধিকার সংগঠক তরিকুল ইসলাম লিটন, মাদকবিরোধী জোট কুমিল্লার আহ্বায়ক মো. আব্দুস সামাদ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) কুমিল্লার সমন্বয়ক আব্দুর রাজ্জাক, কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চের সদস্য সচিব নাসির উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মমিন, এনসিপি কুমিল্লা মহানগরের সভাপতি সিরাজুল হক প্রমুখ।
বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় আলোচিত স্কুলছাত্র ইথান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে উল্লেখ করে বলেন, ইথান আজ শয্যাশায়ী। এমন ঘটনা পুরো কুমিল্লাবাসীর জন্য লজ্জার। মাদককে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, অস্ত্রের ব্যবহার, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে মাদক এখন জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। তারা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, এর নেপথ্যের মূল হোতাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অধিকাংশ সময় মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকদের খুব কমই বিচারের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে না। তারা মাদক চক্রের অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, সমাজে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা এমনকি অনেক হত্যাকাণ্ডের পেছনেও মাদকের ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব চোর ও ছিনতাইকারী আটক হয়েছে, তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। তাই মাদক নির্মূল করা গেলে সমাজে অপরাধের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তারা মত প্রকাশ করেন। এ সময় সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ মাদক প্রবেশ বন্ধে আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, মাদকের উৎস বন্ধ না করলে কেবল মাঠপর্যায়ের অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তঃজেলা মাদক চক্র ভেঙে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা। এসময়, মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মহিউদ্দিন লিটনের নেতৃত্বে কলেজটির প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এবং প্রভাষক শরীফের নেতৃত্বে রেসিডেন্সিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। সংহতি প্রকাশ করেন ইস্টার্ণ ইয়াকুব প্লাজা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মঞ্জুরুল আলম ভূইয়াসহ আরো অনেকে।