কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুরে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরের সড়ক পাকা করণকে কেন্দ্র করে এলজিইডি ও বনবিভাগের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় রাস্তা নির্মাণে সহযোগিতার জন্য বনবিভাগকে ডিও লেটার দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি বনবিভাগ, দিয়েছেন পাল্টা জবাব। বনবিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনে পাকা সড়ক নির্মাণ আইনবিরোধী এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘন বনের বুক চিরে পাহাড়ের উপর দিয়ে বয়ে গেছে পথটি। মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে শুরু হয়ে রাস্তাটি পৌঁছেছে কালারমারছড়ায়। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বনের এই রাস্তাটি পাকা করতে চায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, এলজিইডি। কিন্তু এতে বাঁধ সেধেছে বনবিভাগ।
বনবিভাগ বলছে, যে বনের ভেতর দিয়ে এলজিইডি পাকা রাস্তা করতে চায় সেটি সংরক্ষিত বন। সরকারের আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। এতে বন এবং বন্যপ্রাণী উভয়ে হুমকির মুখে পড়বে। তাদের দাবি, এটি নানা প্রজাতির গাছপালার পাশাপাশি হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, জাপান সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়ার পর তারা কাজও শুরু করে। ইতোমধ্যে সমতলের কিছু অংশে ঢালাই দিয়ে রাস্তা পাকা করা হয়েছে। নির্মাণ করা হচ্ছে কালভার্টও। কিন্তু বনবিভাগের আপত্তির পর কিছুটা গতি কমেছে কাজের। উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও এখনো কোনও সমাধান আসেনি। এরইমধ্যে এলজিইডির পক্ষ নিয়ে বনবিভাগকে চুপ করাতে চান স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ। গত মার্চ মাসের শেষের দিকে পাকা রাস্তা নির্মাণে বাঁধা সৃষ্টি না করে সহযোগিতা করার জন্য বনবিভাগকে ডিও লেটার দেন সংসদ সদস্য। কিন্তু তাতে চুপ হয়ে যায়নি বনবিভাগ। সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের পাল্টা জবাব দিয়ে বনবিভাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা সংরক্ষিত বনের ভেতর রাস্তা করতে দিবে না। কারণ হিসেবে আইনের ব্যাখ্যা উল্লেখ করে বনবিভাগ অনুরোধ করেছে সংরক্ষিত বনে কিছু করতে হলে সরকার প্রধানের অনুমতি প্রয়োজন।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর ১২ নম্বর মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ একর বনভূমিকে ১৯৫৭ সালে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করা হয়। মূলত বন্যপ্রাণী ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বন উজাড় ও অবৈধ দখল প্রতিরোধের জন্য সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করা হয়। তবে এলজিইডি মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি দাবি করেন, এটি তাদের গেজেটভুক্ত রাস্তা। বনবিভাগের আপত্তির কারণে কাজ আগাতে পারছে না। বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছে।
তিনি জানান, জনগণের প্রয়োজনের নিমিত্তে রাস্তাটি পাকা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিচের অংশে কিছু কাজ হয়েও গেছে। কিন্তু বাঁধার কারণে আটকে আছে। কক্সবাজার উপকূলীয় বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, পায়ে হাঁটার পথ থাকলেও সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। পাকা রাস্তা হলে পাচারকারীরা বন উজাড় করে ফেলবে, দখল হয়ে যাবে বনভূমি। তিনি দাবি করেন, এলজিইডি রাস্তার কাজ বন্ধ না করলে তারা আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম জানান, উন্নয়নের নামে বন ধ্বংস করা সরকারি দপ্তরের কাজ হতে পারে না। বিশেষ করে জাইকার মতো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন করার ক্ষেত্রে পরিবেশগত দিক বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তিনি জানান, যেখানে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী বন রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সেখানে একজন এমপি বন ধ্বংসে ডিও লেটার দেবেন সেটা কখনো কাম্য নয়। ডিও লেটারের বিষয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্য নেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোনের পর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেমএম ঘাট থেকে শুরু হওয়া সড়কটির কিছু অংশ সমতল। উভয়পাশে কিছু মানুষের বসতিও রয়েছে। এলজিইডি কাজ বন্ধ থাকার কথা বললেও সমতল অংশে কিছু শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়া সড়কের বেশিরভাগ অংশ ঘনবন আর পাহাড়ের ভেতর।
স্থানীয়রা বলছেন, সড়কটি পাকা হলে দুই ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতে দূরত্ব কমে আসবে। তবে আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে সাধারণ মানুষের প্রবেশ, গাছ কাটা, পশুচারণ, শিকার বা কোনও ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।