টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও দফায় দফায় বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিস্ফোরণের শব্দে এপারের সীমান্ত এলাকা কেঁপে উঠছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুর থেকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনের বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকায় সংঘর্ষ চলছে। এর আগে, বুধবার (১ জুলাই) দিন ও রাতে মংডু শহরে বিমান থেকে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, দুপুরের দিকে রাখাইনের বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকা থেকে বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায়। এতে হোয়াইক্যং সীমান্তের বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। এ পর্যন্ত অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, প্রায় এক বছর আগে হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছিল। তখন সীমান্ত এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন। এখন আবারও নতুন করে হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইনে হামলা ও সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হ্নীলা মৌলভীবাজারের বাসিন্দা জেলে রহমত উল্লাহ বলেন, সকালে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। দুপুরের দিকে মৌলভীবাজারের ওপারে রাখাইন সীমান্ত থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কে মাছ ধরা বন্ধ করে দ্রুত ফিরে এসেছি। এর আগে বুধবার রাত ৯টার পর থেকে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছে। সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে যুদ্ধ বিমানের শব্দও। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কেঁপে উঠছে সীমান্তবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি, ফলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
টেকনাফের সীমান্ত ঘেঁষা সাবরাং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, রাত ৯টার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে শাহপরীরদ্বীপসহ আশপাশের এলাকায় শব্দের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে। এতে সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ দিলু বলেন, কয়েকটি বিকট শব্দ টেকনাফ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নাফ নদীর দিক থেকে মাঝে মাঝে আগুনের ঝলকানিও দেখা যাচ্ছে, যা কিছুক্ষণ পর আবার নিভে যাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ যুদ্ধের কারণে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকার খাইংখালী, পালংখালী, রহমতের বিল, আঞ্জুমান পাড়া ও টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, পৌরসভা, সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় দিয়ে আজ রাত ৯ টা থেকে বোমা ও মর্টার হামলার শব্দে কেঁপে ওঠে উখিয়া-টেকনাফের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের বাড়িঘর।
হ্নীলা মাষ্টার কামাল জানান, আগামী কাল এইচএসসি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতেছে সাড়ে ৯ টায় পর পর ৪টি বিকট শব্দ কেঁপে উঠল বাড়িঘর, পরীক্ষার্থীরা ভয়ে চিৎকার করে কান্না করতেছে। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাট্যংপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, মিয়ানমারে থেকে অনেক দিন পরে বোমার এমন শব্দ কোনো দিন শুনিনি। মনে হয় বাংলাদেশ সীমান্তে এসে সব মর্টারশেল পড়ছে। সীমান্তের একদম পাশে আমার বাড়ি। এত বিকট শব্দে আমার বাড়ি যেভাবে কেঁপে ওঠে তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারছি না।
পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা মামুন বলেন, দীর্ঘদিন মিয়ানমারে যুদ্ধ বন্ধ থাকলেও রাত সাড়ে ৯ টা থেকে আবারও বোমা ও মর্টারশেলের শব্দে আতঙ্কে রয়েছি। শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে বসবাসকারী সিনিয়র শিক্ষক জাকারিয়া আলফাজ জানান, ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ কাঁপছে ঘরবাড়ি মনে হচ্ছে বাংলাদেশ ভূমিকম্প হয়েছে।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পরে আবার পর পর বজ্রপাতের মত বিকট শব্দ কাঁপছে হ্নীলার ঘরবাড়ি আমার বাড়িও কাঁপছে। টেকনাফ ব্যাটালিয়ন ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বিস্ফোরণের বিকট শব্দ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাত ৯টার দিকে মিয়ানমারের মংডু এলাকার সীমান্তের ওপারে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। ওই গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা যাচ্ছে। যার কারণে অনেক স্থানে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। আমরা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। তবে প্রাথমিকভাবে জেনেছি শাহপরীরদ্বীপ থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি চলছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিস্ফোরণের শব্দের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। বিজিবিও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।