দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে চান এইচএসসি পরীক্ষার্থী মারুফ

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ৩ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে চান এইচএসসি পরীক্ষার্থী মারুফ

‘সবাই পারলে আমি কেন পারবো না’, এই জেদ থেকেই সমস্ত অপমান-অপবাদ-লাঞ্ছনাকে পাশ কাটিয়ে বৃহস্পতিবার(২জুলাই) এইচএসসি পরীক্ষার টেবিলে বসতে পেরেছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হাফেজ মো: মারুফ উল্যাহ। কুড়িগ্রামের রাজারহাট ফাজিল মাদরাসার দোতলা ভবনের শেষ প্রান্তে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে সে। শ্রুতি লিখনে তাকে সহযোগিতা করছে তার ভাতিজি ছুম্মা আক্তার। তার এই পথচলাটা মসৃন ছিল না, ছিল কণ্টকময়। চারদিক থেকে বাঁধা, অর্থনৈতিক টানাপোড়ন আর প্রতিকূল পরিবেশ তাকে আটকাতে পারেনি। চোখে না দেখলেও মনের চোখ দিয়ে জ্ঞান আহরণে যেন বদ্ধপরিকর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ।

মারুফ জানায়, চোখে না দেখার কারণে আমাকে বাড়ির পাশের স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। শিক্ষকরা মুখের উপর বলেছেন, একে দিয়ে পড়াশুনা হবে না। চোখে দেখো না গ্রামার শিখে লাভ কি! আমার পড়াশুনাটা সহকর্মীরা যেন মেনে নিচ্ছিল না। শিক্ষকরাও বিরক্ত হতেন। আমি পড়তে গিয়ে অনেক বাজে ট্রলের শিকার হয়েছি। কখনো কখনো এক একটা দিন যেন এক একটা বছর মনে হতো। তারপরও আমি থেমে থাকিনি। আমার কাছে পরীক্ষাটা মূল উদ্দেশ্য ছিল না, মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জন করা। এভাইে নিজের জীবনের কন্টকময় দিকগুলোর কথা তুলে ধরলেন পরীক্ষার্থী হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বুজরুক নূরপুর গ্রামের সন্তান হাফজ মারুফ উল্যাহ। সে আলিম পরীক্ষার্থী। পরিবারে দু’ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। বড় ভাই সেনাবাহিনীতে চাকরী করে। বাবা গোলজার হোসেন মারা গেছেন ২০১৯ সালে। মা শাহজাদি বেগম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে লেখাপড়ার উপর জোর দিয়েছিলেন। মায়ের উৎসাহে ও প্রতিবেশীদের সহাযোগিতায় আজ সে এতদূর আসতে পেরেছে।

মারুফ জানান, “যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আমি দেখলাম। আমার যদি কখনো সুযোগ হয়, একদিনের জন্যও সুযোগ হলে আমি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের উপযুক্ত শিক্ষার জন্য কিছু করতে চাই। পড়াশুনাকালিন সময়ে আমি সহপাঠীদের প্রাইভেট পড়িয়েছি। আমি কিন্তু কোন টাকা নেইনি। যারা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আছেন তারা যেন আমার মত কষ্টের মধ্যে পরতে না হয়। এজন্য তাদের জন্য কিছু করতে চাই।”

মারুফ আরও জানায়, “বাড়ির পাশের স্কুল থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয়ার পর আমি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হই। এফতেদায়ি পরীক্ষার পর ৬ষ্ট শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সমায় ক্লাসে এমন কোন অপমান নাই যা আমাকে করা হয় নাই। শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী সবাই আমাকে পড়াশুনায় বাঁধা দিয়েছে, অপমান করেছে। শিক্ষকরা মুখের উপর বলেছেন, চোখে দেখো না গ্রামার শিখে লাভ কি! এরপর ২০২২ সালে আমি ফরিদপুর আব্দুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসায় ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেইটাই ছিল আমার গোল্ডেন টাইম। ওখানে সুপার শাহ আলম হুজুর থেকে ম্যাডাম নাজমুন নাহার এবং টিচাররা আমাকে মোটিভিশন করা ও দিক নির্দেশনা দিতেন। সুপার শাহ আলম স্যার সময় পেলেই আমাকে গ্রামারসহ অন্যান্য সাবজেক্টের পড়া আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিতেন। অথচ আমাকে ভর্তি করার জন্য তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। আমি ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক টিচারের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে ক্লাস পরীক্ষায় আমাকে কম নাম্বার দেয়া হয়েছিল। এসব প্রতিকূল পরিবেশ ও চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে আমি পড়াশুনা চালিয়ে গেছি। তবে আমার সুপার গোল্ডেন টাইম ছিল ফরিদপুর থেকে কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া। এরপর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে, আমার এতদূর আশার পিছনে যে জিদটা কাজ করেছিল, তা হলো সবাই পারলে আমি কেন পারবো না। এই জিদ থেকেই আমার এতদূরে আসা। তবে আমার কাছে পরীক্ষাটা মূল উদ্দেশ্য ছিল না, মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জন করা।” এভাইে নিজের জীবনের কন্টকময় দিকগুলোর কথা তুলে ধরলেন পরীক্ষার্থী হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ।

মারুফ নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, খারাপ সময় কখনো না কখনো চলে যাবে, তোমাকে কেউ দেখতে পারে না এজন্য পড়াশুনা করে কি হবে এসব চিন্তা করা যাবে না। হয়তো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধীরা ভালো কিছু করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে পড়াশুনা করে যদি কিছুই না হয়, চাকরী না হয় তাহলে নিজেকে তো প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। সন্তানদেরকে মানুষ করতে পারবে। সড়কে বা রেললাইনে ভিক্ষাবৃত্তি না করে পরিশ্রমের মাধ্যমে একটা স্টাবলিস্ট জীবন যাপন করতে পারবে। নিজের মতামতটা দিতে পারবে।

মারুফ আরও জানায়, আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, আমার পড়াশুনার জন্য এলাকাবাসীর কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু বলতে কষ্ট হয় আমার কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে এমন ব্যবহার পেয়েছি যে, এক একটা দিন যেন এক একটা বছর মনে হয়েছিল। পরিবার ও প্রতিবেশীরা সাপোর্ট দিয়েছিল বলে আমি কুড়িগ্রাম এসে পড়াশুনা করতে পারছি। তবে একটা মানুষ যদি ভালো কিছু করতে চায় তাকে পজেটিভভাবে নেয়া উচিত। কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদরাসার মোফাচ্ছির মাজিদুর রহমান জানান, প্রতিবন্ধকতা সত্বেও মারুফ সুদূর রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। ছাত্র হিসেবে সে আমাদের মন জয় করেছে। তার জানার আগ্রহ আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সে একজন হাফেজ। ক্লাসে তার রেসপন্স অনেক ভালো। সে আরও উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াক এই কামনা করছি। এছাড়াও সরকার যদি শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের পাশে দাড়ায় তাহলে অন্যান্যরা অনুপ্রেরণা পাবে।

রাজারহাট ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হাই বলেন, রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী ছিল ৩২৯ জন এর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল ১৬জন। আমাদের কেন্দ্রে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষা দিচ্ছে। একজন শ্রুতি লিখনীর মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে সে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা তাকে দেওয়া হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে