নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে রংপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশেষ সেমিনার। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর ১২ টায় রংপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, রংপুর- এর যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, রংপুরের উপ-পরিচালক সেলোয়ারা বেগম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহিন সুলতানা। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, এনজিও প্রতিনিধি, নারী নেত্রী, ইমাম, মুয়াজ্জিন, কাজী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা সেমিনারে অংশ নেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গঠন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। বাল্যবিবাহ শুধু একটি মেয়ের জীবনকেই থামিয়ে দেয় না, এটি একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। কোথাও বাল্যবিবাহ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, সমাজে মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ইমাম, কাজী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া বাল্যবিবাহ ও সহিংসতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।” সভাপতির বক্তব্যে সেলোয়ারা বেগম বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিশুর নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠন সমন্বিতভাবে কাজ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রংপুরকে বাল্যবিবাহ মুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।” মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ কারীরা বলেন, দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, অজ্ঞতা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রধান, ইমাম, মুয়াজ্জিন, কাজী, মহিলা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সহযোগী এনজিওর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেমিনারটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সেমিনারের শেষ পর্বে উপস্থিত সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বক্তারা বলেন, প্রশাসনের একার পক্ষে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং গণমাধ্যম একযোগে কাজ করলেই একটি নিরাপদ, সহিংসতামুক্ত ও বাল্যবিবাহমুক্ত রংপুর গড়ে তোলা সম্ভব।