দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম | প্রকাশ: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। ইতিমধ্যে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। আর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৫১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। চলতি জুন মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা গত মাসের তুলনায় বেড়েছে প্রায় চারগুণ। বতৃমানে যে হারে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে তাতে সামনে পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। বরং জেলা ও গ্রামীণ এলাকাতেও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৭৮ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। তার মধ্যে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ওই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪৪০ জন ডেঙ্গু আক্রান- হয়েছে। বিশেষ করে পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এডিস মশার প্রজনন বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় ক্রমাগত বাড়ছে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণাধীন স্থাপনায় পানি জমে থাকা এবং পর্যাপ্ত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে দেশের ডেঙ্গুর বিস্তার। যদিও সরকারের জনস্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে। ওই লক্ষ্যে সরকার সমপ্রতি ১৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ওই টাস্কফোর্স মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। টাস্কফোর্সের প্রধান কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা এবং মাঠ পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জাতীয় কমিটিকে অবহিত করা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।

সূত্র জানায়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কার্যকর মশানাশক ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।  যাতে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সমন্বিত মশক নিধন অভিযান পরিচালনা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ডেঙ্গু টিকা চালু এবং বছরজুড়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে ডেঙ্গু প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আর তা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছরের মে মাসে যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন, জুন মাসে তা বেড়ে দুই হাজার ১২০ জনে দাঁড়িয়েছে। যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট ১৩ জনের মৃত্যুর মধ্যে জুন মাসেই অধিকাংশ রোগী মারা গেছেন।

সূত্র আরো জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ জন। তার মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২০২৫ সালের ওই সময়ে ভর্তি হয়েছিল ৮ হাজার ৮৭০ জন আর মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের। ওই তুলনায় ডেঙ্গু নিয়ে এবার এখনো হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কম। এবার জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৪১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন এবং জুনের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ২ হাজার ৩১৮ জন ভর্তি হয়েছে। তবে চলতি বছরের মে মাসের ২৫ দিনে যেখানে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬০৯ জন, সেখানে জুন মাসের ২৫ দিনে ভর্তি হয় ২ হাজার ৩১৮ জন। এক মাসের ব্যবধানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৮১ শতাংশ বেড়েছে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বিভাগে বিভিন্ন হাসপাতালে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৫ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩১ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৩ জন এবং রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। তাছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ১৪৮ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন এবং জুনে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুর আগাম প্রস্তুতি এবার ভালো। সচেতনতা কিছুটা বাড়ায় এখনো আক্রান্ত কম। তবে এবার মাসিক বৃদ্ধির হার বেশি। এভাবে বাড়তে থাকলে একটা সময় পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে। সেজন্য যেসব জায়গায় রোগী বেশি, সেসব এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রকোপ ঠেকানো জরুরি। আর ডেঙ্গু কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয় তা সবারই জানা। মূলত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি মশার বিস্তার আটকানো না যায় তাহলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমানো যাবে না। 

অন্যদিকে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে গত ২৩ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রথম সভা হয়েছে। সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ সভায় আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে