ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দাওগাঁও ইউনিয়নের কাঠবওলা বাজারের পাশে বানার নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তিনতলা একটি মসজিদ। কয়েক মাস আগেও যেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন মুসল্লিরা, সেখানে এখন আতঙ্কের নাম ফাটল। মসজিদের ওজুখানা ও টয়লেট ইতিমধ্যে ভেঙে নদীতে চলে গেছে। মূল ভবনের দেয়ালেও দেখা দিয়েছে একাধিক ফাটল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের সময় ঠিকাদার মসজিদের বানার নদীরপাড়ের অংশের গাইড ওয়াল ভেঙ্গে ফেলায় এবং সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে মসজিদটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার দাওগাঁও ইউনিয়নের বানার নদীর তীরে কাটবওলা বাজারে কাটবওলা জামে মসজিদ অবস্থিত। মসজিদের পাশ দিয়ে দুইপাড়ের মানুষের যাতায়াতের জন্য বানার নদীর ওপর পুরাতন সেতুটি ভেঙ্গে নতুন একটি সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণালয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অনুমোদন হয়। স্বর্ণা ব্রিক্স নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সেতু নির্মাণের কাজ পায়। ঠিকাদার সেতুর পিলার স্থাপন করার জন্য পিলারের পাইলিং করার সময় পাশে থাকা তিনতলা মসজিদের নদীর পাড়ের অংশের গাইড ওয়াল ভেঙ্গে ফেলে। মসজিদ কমিটির লোকজন ও স্থানীয় মুসল্লিরা এতে বাঁধা দেয়। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পাইলিং করার পর মাটি ভরাট করে পুণরায় গাইড ওয়াল নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে। তিন বছরে সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করলেও এখন পর্যন্ত মসজিদের পাশের অংশে মাটি ভরাট করে গাইড ওয়াল নির্মাণের কোন উদ্যোগ নেই। এ ব্যাপারে এলাকাবাসী বারবার ঠিকাদারের লোকজনের সাথে কথা বলেছে। তারা আজ করবে, কাল করবে বলে ৩ বছর পার হয়ে গেল। এদিকে গাইড ওয়াল না থাকায় চলতি বর্ষায় মসজিদের নদীর পাড়ের অংশের মাটি সরে গেছে। এতে করে মুসল্লিদের ওযুর স্থান, টয়লেট ভেঙ্গে নদীতে চলে গেছে। বারান্দার ফ্লোরের নিচের মাটি সরে গেছে এবং মসজিদ ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সম্পূর্ণ মসজিদটি নদীতে বিলিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর আগে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাদের আশ্বস্ত করেছিল, মসজিদের কোনো ধরনের ক্ষতি হতে দেওয়া হবে না। নির্মাণকাজের কারণে যদি কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে তা মেরামত করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি মসজিদের উন্নয়নেও সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু বর্তমানে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির পরও ঠিকাদারের কাছ থেকে তারা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন।
স্থানীয়রা জানান, সমস্যার কথা জানাতে গেলে ঠিকাদার উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। আবার উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে গেলে তিনি বিষয়টি ঠিকাদারের সঙ্গে সমাধানের কথা বলেন। এতে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মসজিদ কমিটির সদস্যরা জানান, ওজুখানা ও টয়লেট ধসে পড়ায় মুসল্লিদের দুর্ভোগ বেড়েছে। প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। ভবনের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় পুরো স্থাপনাটির স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে জরুরি প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সেতুর নির্মাণকাজের ঠিকাদার স্বর্ণা ব্রিকসের মালিক আতিকুল ইসলামের সাথে ফোনে একাধিকবার যেগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটস এ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
মুক্তাগাছা উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, "মসজিদের ক্ষতির বিষয়টি আমরা জেনেছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারিগরি দল ক্ষয়ক্ষতির কারণ ও ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করবে। যদি নির্মাণকাজের সঙ্গে ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া যায়, তাহলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, সেতু নির্মাণ করার সময় কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, মসজিদের বারান্দায় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং নিচে থেকে মাটি সরে গেছে। সেতু নির্মাণকারী ঠিকাদার নিজে এটা ঠিক করে দিবে। তিনি বলেন, সপ্তাহখানেক আগে আমাদের পিডি মহোদয় এখানে এসেছিলেন এবং মসজিদটির একাংশ ভেঙে গেছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে তিনি এটি দেখেছেন। তিনি (পিডি) ঠিকাদারকে বলেছেন, ঠিকাদার কাজটি করেদেওয়ার আশ্বাস দেন বলে জানান। আমরা লোকাল প্রশসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা চাইলে আমরা তা দেওয়ার চেষ্টা করব।