৩ কিমি সড়কের অভাবে ৩০ কিমি পথ ঘুরে যাতায়াত করে তিস্তাচরের ১৫ হাজার মানুষ

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) :
| আপডেট: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২১ পিএম | প্রকাশ: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
৩ কিমি সড়কের অভাবে ৩০ কিমি পথ ঘুরে যাতায়াত করে তিস্তাচরের ১৫ হাজার মানুষ

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর পশ্চিম তীরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে প্রতিদিনের বাস্তবতা যেন এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কেচ্চা কাহিনী। মাত্র ৩ কিলোমিটার সড়ক না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উপজেলা পরিষদে যেতে তাদের অতিক্রম করতে হয় প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ। এভাবেই ৫৬বছর ধরে অবহেলায় পড়ে আছে চরাঞ্চলের ৬টি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবার। যেখানে বসবাস প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের।

মঙ্গলবার(২৮জুলাই) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর মনম্বর, চর চতুরা, চর গতিয়াসাম ও চর খিতাবখাঁ-এই ছয়টি চরে রয়েছে অন্তত ২০টির বেশি পাড়া। নদীর ভাঙন-গড়নের সঙ্গে বদলে যাওয়া এই জনপদ আজও উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি বেড়ে গেলে চরবাসীর একমাত্র ভরসা নৌকা। কিন্তু সেই নৌযানেও সময়মতো যাতায়াত সম্ভব হয় না। আবার পানি কমে গেলে নৌকাও চলে না। কোথাও কোথাও নৌকা চললেও বারবার বালুচরে আটকে পড়ে। ফলে মাত্র আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে তিন ঘণ্টারও বেশি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের উন্নয়ন হলেও তাদের জীবনে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। খিতাবখাঁ এলাকার মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল হয়েছে, গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও আমরা একটা রাস্তা, নেই নৌ এ্যাম্বুলেন্স, সেতু বা ভালো হাসপাতাল পাইনি।’

চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘একটা সাধারণ কাগজে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিতে গেলেও আমাদের দুই জেলার ভেতর দিয়ে ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। চেয়ারম্যান না থাকলে পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে যায়।’

চরাঞ্চলের প্রধান সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। ছোট-বড় মিলিয়ে ১০-১২টি কাঁচা রাস্তা থাকলেও বর্ষায় অধিকাংশই পানিতে তলিয়ে যায়। উঁচু পাকা সড়ক না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয়দের।

চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক বিদ্যালয় মাত্র দুটি, সে দু’টিও বারবার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আবার পূন নির্মাণ করে চালু করলেও হুমকীতে রয়েছে। যেকোন মুহুর্তে ভেঙে যেতে পারে। নেই মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। বাল্যবিয়ের প্রবণতাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অভিভাবক মৌল মিয়া ও জাফর আলী জানান, পানি পার হতে বাচ্চারা দুই সেট কাপড় নিয়ে যায়। এক কাপড়ে পানি পাড়ি দিয়ে পরে অন্য কাপড় পরে স্কুলে যায়।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ৮ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ‘চর বিদ্যানন্দ কমিউনিটি ক্লিনিক’। সেটিও চরের বিপরীতে অবস্থিত। সেখানে কর্মরত আছেন একজন মাত্র স্বাস্থ্যকর্মী।

স্বাস্থ্যকর্মী রুফাইদা ইয়াসমিন বীমা বলেন, ‘আমি একাই এখানে দায়িত্ব পালন করছি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন রোগী আসে, কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, জনবলও নেই। এতে চিকিৎসা দিতে খুবই সমস্যা হচ্ছে।’

জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে পারে না। নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও নেই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের শরণাপন্ন হন।

চরের মাটিতে সোনা ফলে। সেখানে বাদাম, আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ নানা ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

কৃষক নুরুল হক মুন্সি বলেন, ‘আমাদের রিলিফ দরকার নেই। রাস্তা থাকলে আমরা নিজেরাই ফসল বিক্রি করে ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের দেখা মেলে না। চর বিদ্যানন্দের আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এলাকায় রাস্তা-ঘাট কিছুই নাই। চলাফেরা করতে পারি না। কাউন্সিলে যেতে ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।’

একই সুরে কথা বলেন হায়দার আলী, ‘নির্বাচনের আগে নেতারা আসে, ভোট শেষ হলে আর দেখা যায় না।’

এবিষয়ে বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘চরবাসীরা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে আসতে পারে না। অনেক কষ্ট করে আসে, প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তাদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।’

তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা একটাই-একটি টেকসই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। মাত্র ৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণই বদলে দিতে পারে তাদের জীবন। উন্নয়নের এই বৈষম্য দূর করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ।#  ০১৭১৯০২৬৭০০

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে