শেরপুরে কার্যক্রম বন্ধ এতিমখানায় ৪ লাখ টাকার অনুদান, তদন্ত কমিটি গঠন

এফএনএস (সৌরভ অধিকারী শুভ; শেরপুর, বগুড়া) : | প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
শেরপুরে কার্যক্রম বন্ধ এতিমখানায় ৪ লাখ টাকার অনুদান, তদন্ত কমিটি গঠন

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার একটি সরকারি নিবন্ধিত এতিমখানা দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীনভাবে পড়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে গত দুই অর্থবছরে সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান হিসেবে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই। অধিকাংশ সময় ভবনটি তালাবদ্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও উত্তোলন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ ঘটনায় অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কার অভিযোগ তুলে গত ২৭ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন। এর আগে একই অভিযোগ গত ১৩ জুলাই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও জমা দেওয়া হয়।

এলাকাবাসীর পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন গত ২৭ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ১৩ জুলাই একই অভিযোগ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী ও সহসভাপতি আবু রায়হান তেঁতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।

এঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে  উপজেলার অফিসারদের মধ্যে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার সমন্বয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে আগামী ৭(সাত) কর্ম দিবসের মধ্যে এ তদন্ত কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিদের্শনা দেয়া হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের খুরতা গ্রামের সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং (নিবন্ধন নম্বর-১২৪৪/০৭) দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন। প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ছাত্র ও শিক্ষক নেই। বর্তমানে ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর উপজেলায় সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০টি। এর মধ্যে মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান উত্তোলন করেছে। দুই অর্থবছরে মোট উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।

খুরতা গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, রেজাউল করিম ও মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রায় দুই বছর আগে এতিমখানাটি চালু করা হয়। সেখানে সাতজন ছাত্র ছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। ছাত্রপ্রতি প্রায় দুই হাজার টাকা হারে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো। বছরে দুই দফায় ছয় মাস অন্তর এ অনুদান আসত। তবে অনুদান আসার আগে কিছুদিন প্রতিষ্ঠানটি খোলা থাকলেও টাকা উত্তোলনের পর আবার সেটি বন্ধ করে দেওয়া হতো। সেই টাকার হিসেব পাই নাই। বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাইম ইসলাম বলেন, ‘চলতি মাসের প্রথম দিকে আমি নিজেই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ভবনটি তালাবদ্ধ। সেখানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল না। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারি, সরকারি অনুদান আসার সময় সাময়িকভাবে কার্যক্রম দেখিয়ে পরে আবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল। তিনি বলেন, ‘২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছি। দায়িত্বে থাকা হুজুর শিক্ষকরা পাশের একটি নতুন মাদ্রাসায় চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও সেখানে চলে গেছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী আবারও প্রতিষ্ঠান চালু হবে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। সরকারি অনুদানের অর্থ এখনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবেই রয়েছে।’ এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। অনুদানের টাকা প্রতিষ্ঠানের একাউন্টে আছে।

বক্তব্য জানতে তৎকালীন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা(বর্তমানে সহকারি পরিচালক- জেলা শেরপুর) মো. ওবায়দুল হকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। ্এ সময় তিনি বলেন, “আমার সময় ওই গ্রামের সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিংটিতে অনেক এতিম ছাত্র ছিলো। তবে আমার বদলির পর ওই প্রতিষ্ঠানে মুহতামিমকে ও পূর্বতন সভাপতিকে অপসারণ করা হয়েছে। তবে যদি অনিয়ম হয় থাকে, তাহলে ওই সময়তো কেউ অভিযোগ করেনি” এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ঘটনার অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ২০২৬ এ সর্বশেষ যে টাকাটা গিয়েছে (২ লাখ ৩৯ হাজার) সেটা নিয়ে ব্যাংকে কথা বলে ফ্রিজ করে দেয়া হয়েছে। ওই অর্থ আর উঠাতে পারবে না।  তবে বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে