জবিতে ছাত্রদল, জকসু ও ছাত্রশক্তির সংঘর্ষ, আহত কয়েকজন

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম | প্রকাশ: ৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
জবিতে ছাত্রদল, জকসু ও ছাত্রশক্তির সংঘর্ষ, আহত কয়েকজন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রবেশ ও কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন ও শহীদ মিনার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে তিন পক্ষের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের কয়েকজনকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ একরামুল হক সাদিদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে জকসুর কয়েকজন নেতা-কর্মী ও অন্য সংগঠনের কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এসব প্ল্যাকার্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে স্থায়ী আবাসিক হল নির্মাণ, মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা, চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের দাবি তুলে ধরা হয়।

জকসু ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউজিসি চেয়ারম্যানের সামনে এসব দাবি তুলে ধরতেই প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা ধাক্কাধাক্কিতে গড়ায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে জকসুর নেতা-কর্মীরা মিলনায়তনের প্রবেশমুখের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের কয়েকজন সদস্যও সেখানে ছিলেন। পরে সেমিনার ও অবস্থান কর্মসূচি শেষ হওয়ার সময় শহীদ মিনারের সামনে আবারও ছাত্রদল, জকসু ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

সংঘর্ষে জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক, জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে। আহতদের কয়েকজনকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে আসার পর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। তাঁর দাবি, এ সময় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ তাঁদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। নিজের ওপর হামলার বর্ণনা দিয়ে শাহীন মিয়া বলেন, তাঁর মুখ, নাক, পা ও হাতে লাথি মারা হয়েছে।

জকসুর নেতারাও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছেন। জকসুর এজিএস মাসুদ রানা বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে গেলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা দুই দফায় হামলা চালান। এতে জকসু ছাড়াও ছাত্রশক্তি ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। জকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুকের পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

জকসুর সহসভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও অবস্থান কর্মসূচির বিষয়টি তুলে ধরেন।

তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদকে অপমানিত করার জন্য ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতারা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁদের সরে যেতে অনুরোধ করা হলেও তাঁরা সরে যাননি। একপর্যায়ে তাঁরা সামনে এগিয়ে এলে মারামারি শুরু হয়।

মেহেদী হাসান হিমেল দাবি করেন, সংঘর্ষে ছাত্রদলেরও বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব শামসুল আরেফিনও অভিযোগ করেন, জকসুর ব্যর্থতা ও সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই এসব করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও মব করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, আবাসনের অধিকার রুখে দেওয়ার চেষ্টা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফের অভিযোগ, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে গেলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুরের অভিযোগ করেন। এ ঘটনার পেছনে কয়েকজন শিক্ষকের মদদ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান।

ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের সামনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মঙ্গলবার বিকেলে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। প্রশাসনের ভাষায়, কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের বাইরে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে ‘হাতাহাতি’ হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে প্রশাসন মনে করেছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মেজবাহ উল আলম সওদাগর। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. শাহিনুজ্জাহ।

প্রশাসন জানিয়েছে, কমিটি ঘটনার সার্বিক তদন্ত করে দায়ীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন সব পক্ষকে ধৈর্য ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। কেউ যেন কারও প্রতি মারমুখী আচরণ না করেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেন।

উপাচার্য জানান, পরিস্থিতি শান্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি নিজে সহকর্মীদের নিয়ে তিন থেকে চারবার সবাইকে থামানোর চেষ্টা করেছেন। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং এরপর দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের সংঘাতকে প্রশ্রয় দেয় না। ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসা নেওয়াকে কেন্দ্র করেও পরে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বিষয়ে বলেন, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ বা দেশের অন্য কোথাও এ ধরনের সহিংসতা ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা সমর্থন করে না।

ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তের পরই সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, কারা এতে জড়িত এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত ছাত্রদল, জকসু ও ছাত্রশক্তি, তিন পক্ষই ঘটনার জন্য একে অন্যকে দায়ী করছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে