শ্রমিকের জীবন রক্ষা করেই শিল্পকে বাঁচাতে হবে: আসলাম চৌধুরী

এফএনএস (জহিরুল ইসলাম; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম) : | প্রকাশ: ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
শ্রমিকের জীবন রক্ষা করেই শিল্পকে বাঁচাতে হবে: আসলাম চৌধুরী

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগের পাশাপাশি শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দুর্ঘটনার দায়ে সম্ভাবনাময় এই শিল্প বন্ধ না করে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আধুনিকায়নের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শ্রমিকের জীবন রক্ষা করেই শিল্পকে বাঁচাতে হবে।

সম্প্রতি ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা, গ্যাসমুক্ত সনদের যথার্থতা, আবদ্ধ ট্যাংকে শ্রমিক প্রবেশ, বায়ু চলাচল এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরনো জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংক ও আবদ্ধ স্থানে তেল, গ্যাস বা রাসায়নিক পদার্থের অবশিষ্টাংশ থেকে বিপজ্জনক গ্যাস জমে থাকতে পারে। বাইরে থেকে ট্যাংক নিরাপদ মনে হলেও ভেতরে প্রাণঘাতী পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া সেখানে শ্রমিক প্রবেশ করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এ অবস্থায় শুধু কাগজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রতিটি ধাপে বাস্তব নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন আসলাম চৌধুরী। তাঁর মতে, জাহাজ কাটার আগে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে গ্যাস পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।

আসলাম চৌধুরী বলেন, কাগজে-কলমে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেই হবে না, বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একজন শ্রমিক জীবিকার জন্য কাজে আসবেন, জীবন দিতে নয়।

তিনি বলেন, জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িত। তাই কোনো দুর্ঘটনার পর আবেগের বশে পুরো শিল্প বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে কঠোরভাবে সংশোধন করতে হবে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা সরেজমিনে দেখতে উদ্যোক্তাদের তৎপরতাও বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রাইজিং গ্রুপের চেয়ারম্যানের শিপইয়ার্ড পরিদর্শনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জাহাজ রিসাইক্লিং কার্যক্রম পরিদর্শনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিটি শিপইয়ার্ডে নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট চালু করা প্রয়োজন। জাহাজ ইয়ার্ডে প্রবেশের আগে গ্যাসমুক্ত সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংক ও আবদ্ধ স্থানে কাজের জন্য পৃথক নিরাপত্তা প্রটোকল এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল থাকা জরুরি।

আসলাম চৌধুরী বলেন, জাহাজভাঙা শিল্প বন্ধ নয়, নিরাপদ করতে হবে। শ্রমিকের জীবন রক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য সতর্কবার্তা হলেও এটিকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান, দায় নির্ধারণ, নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করা এবং ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এই শিল্প নতুন আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারে। শ্রমিকের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করেই শিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার তাগিদ দিয়ে আসলাম চৌধুরীর বক্তব্যে তাই উঠে এসেছে একটি মৌলিক বার্তা, শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, আর নিরাপদ শিল্পই পারে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা খাতকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে