গত ১৭ বছরে দেশে যে অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে, বর্তমান সরকার তা বন্ধ করে জনগণের কল্যাণে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, বিদেশি সহায়তা আগেও বাংলাদেশ পেয়েছে, কিন্তু সেই অর্থ ও সহায়তার যথাযথ ব্যবহার হয়নি। এখন সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক ও ওয়াটার এইডের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মন্ত্রী। বৈঠকে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, এ খাতে অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
মঈন খান বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে আসছে। তবে অতীতে এসব সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অনেকেই নিজেদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএইডের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে যে ধরনের সহায়তা দেওয়া হতো, সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তার পরিমাণও আগের তুলনায় কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখন নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করে দেশের নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে কাজ করছে।
মঈন খান বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের সাধারণ মানুষের শ্রমে অর্জিত সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করেছে। ভবিষ্যতে দুর্নীতি আরও দূর করে জনগণের অর্থ জনগণের সেবায় ব্যবহার করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এতে অর্থসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। মন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবনধারণের জন্য পানি অপরিহার্য। কিন্তু সেই পানি দূষিত বা জীবাণুযুক্ত হলে তা মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই সবার কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উজানে পানি প্রত্যাহার ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন নদ-নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ভিন্নভাবে পড়ছে।
উত্তরাঞ্চলে নদীর পানি কমে যাওয়ায় মরুকরণ বা ডেজারটিফিকেশনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদীপথ ধরে আরও ভেতরের দিকে উঠে আসছে। এতে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ও লবণাক্ততা বাড়ছে।
মন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দশকে উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের পানীয় জলের সংকট ক্রমেই গুরুতর হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপদ পানি সরবরাহের পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানান মঈন খান। এ উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু একটি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ ও ওয়াটার এইডসহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিরাপদ পানি মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন হওয়ায় এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি।
মন্ত্রী জানান, বৈঠকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। বিশেষ করে ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার উদ্যোগে সহায়তার কথা বলেছেন।
মঈন খান বলেন, মানুষের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া শুধু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়, এটি একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ। অর্থায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পাওয়া প্রতিটি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।