আবাসনকে শুধু সাধারণ মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে না দেখে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্মুক্ত সবুজ স্থানসহ সার্বিক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর জোর দেন তারা। বিশ্ব নগর দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত “বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিতে সবার জন্য মানসম্মত আবাসন”শীর্ষক এক লাইভ টকশো-তে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ১১টায় ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এই টকশো-র আয়োজন করে। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারীর সভাপতিত্বে এবং সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুনের সঞ্চালনায় টকশো-তে প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং 'ভূমিজ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ফারহানা রশীদ তনু। আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “আবাসন খাতকে মূলত রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ওপর ছেড়ে দেওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিপুল জনগোষ্ঠী সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেবল ভবন নির্মাণ করলেই আবাসন নিশ্চিত হয় না; এর সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের সুযোগ থাকতে হবে।” তিনি সরকারের উদ্যোগে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতি প্রণয়ন এবং বড় বড় বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে অন্তত ২০ শতাংশ জায়গা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনে বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেন। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “জনগণের অর্থে উন্নয়ন প্রকল্প হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জলাধার-সবুজ এলাকা ধ্বংসের কারণে নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা 'আরবান হিট' তৈরি করছে।” তিনি জিয়া উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান ও ওসমানী উদ্যানের মতো স্থানগুলোতে কংক্রিটের কাঠামো না বাড়িয়ে সবুজায়নের তাগিদ দেন এবং উন্মুক্ত স্থানে নির্ধারিত সীমার বেশি স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের দাবি জানান। 'ভূমিজ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ফারহানা রশীদ তনু বলেন, “পাবলিক টয়লেটের ক্ষেত্রে কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারের উপযোগী রাখা জরুরি। ইজারা বা লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেবার মানের চেয়ে অধিক রাজস্ব আয়কে গুরুত্ব দিলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না।” তিনি ব্যবহারকারী নাগরিকদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। সভাপতির বক্তব্যে ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, “একটি নগরকে বাসযোগ্য করতে হলে শিশুবান্ধব, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা নিতে হবে। পথচারীদের নিরাপদে হাঁটা ও খেলার মাঠ ব্যবহারের অধিকার আইনগতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।” অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আয়োজক সংস্থাসমূহের পক্ষ থেকে সরকার, সিটি করপোরেশন ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পরিবেশবান্ধব, সুপরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানানো হয়।